ইয়েনের পতন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিরল যৌথ পদক্ষেপ, ভবিষ্যতে আরও কঠোর হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি

ইয়েনের পতন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিরল যৌথ পদক্ষেপ, ভবিষ্যতে আরও কঠোর হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি

বিশ্বের অন্যতম প্রধান মুদ্রা জাপানি ইয়েনের (JPY) ধারাবাহিক পতন রোধ করতে একযোগে মাঠে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে ইয়েনের মান স্থিতিশীল রাখতে এই দুই পরাশক্তি একটি বিরল যৌথ হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উভয় দেশের আর্থিক নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, মুদ্রা বাজারের এই অস্থিরতা দূর করতে এবং ইয়েনের অনাকাঙ্ক্ষিত অবমূল্যায়ন ঠেকাতে তারা যেকোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। বাজার বিশ্লেষকরা এই যৌথ উদ্যোগকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

গত বেশ কিছুদিন ধরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের মান ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। মূলত মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের উচ্চ সুদের হার এবং ব্যাংক অব জাপানের (BoJ) তুলনামূলক নমনীয় আর্থিক নীতির কারণে দুই দেশের মুদ্রার মধ্যে এই ব্যবধান তৈরি হয়। সুদের হারের এই বিশাল পার্থক্যের কারণে বিনিয়োগকারীরা ইয়েন বিক্রি করে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন, যা ইয়েনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য জাপান এককভাবে চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। ফলে মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় এই যৌথ হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মুদ্রা বাজারের অতিরিক্ত ওঠানামা বা অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে তারা পুনরায় এ ধরনের যৌথ বাজার হস্তক্ষেপে অংশ নিতে দ্বিধা করবে না। এই বার্তাটি মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারের ফাটলবাজ বা স্পেকুলেটরদের (Speculators) উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কৃত্রিমভাবে ইয়েনের মান নিয়ে কারসাজি করতে না পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠোর হুঁশিয়ারি সাময়িকভাবে হলেও বাজারে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য কিছুটা কমিয়ে আনবে।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের মুদ্রা বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে রাজী হয় না। এর আগে ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময় ইয়েনের পতন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সর্বশেষ যৌথভাবে কাজ করেছিল। দীর্ঘ সময় পর এই ধরনের পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, ইয়েনের অনিয়ন্ত্রিত অবমূল্যায়ন কেবল জাপানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। জাপানে আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সেখানে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে, যা নিয়ন্ত্রণে যৌথ প্রয়াস অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল।

এই যৌথ ঘোষণার পরপরই মুদ্রা বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দীর্ঘদিনের পতন প্রবণতায় সাময়িক বিরতি এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুদের হারের মৌলিক পার্থক্য দূর না হওয়া পর্যন্ত এই স্বস্তি কতদিন বজায় থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তা সত্ত্বেও, দুই দেশের এই সম্মিলিত অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ করেছে যে, বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় তারা যেকোনো সময় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

Leave a Reply