যুক্তরাজ্যে জ্বালানি চুরি চরম সীমায়: প্রতিদিন লোকসান প্রায় ২ লাখ পাউন্ড, নেপথ্যে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও মূল্যস্ফীতি
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারে। দেশটিতে পেট্রোল পাম্প (ফোরকোর্ট) থেকে তেল চুরির ঘটনা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক শিল্প বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড মূল্যের জ্বালানি চুরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত পাঁচ মাসে পেমেন্ট না করে বা টাকা না দিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা অন্তত এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চুরির ঘটনাগুলোকে স্থানীয়ভাবে ‘ড্রাইভ-অফ’ বা ‘নো মিনস টু পে’ (টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকা) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দিন দিন এই হার যেভাবে বাড়ছে, তাতে যুক্তরাজ্যের পাম্প মালিকেরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
খুচরা জ্বালানি বিক্রেতাদের সংগঠনগুলোর মতে, মূলত দুই উপায়ে এই চুরি সংঘটিত হচ্ছে। প্রথমত, কিছু চালক গাড়িতে তেল ভর্তি করার পর কাউন্টারে টাকা না দিয়েই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যান। দ্বিতীয়ত, অনেকে তেল নেওয়ার পর কাউন্টারে গিয়ে দাবি করেন যে তাদের কাছে এই মুহূর্তে টাকা বা কার্ড নেই, পরবর্তীতে তারা পরিশোধ করবেন; কিন্তু পরবর্তীতে আর কখনোই সেই অর্থ পরিশোধ করতে আসেন না।
ইরান সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাজ্যে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ এমনিতেই জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে জর্জরিত, তার ওপর জ্বালানির এই অতিরিক্ত মূল্য সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে অসাধু চক্রকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা থেকেই অনেকে এ ধরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, যা প্রতিরোধ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষেও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ চুরির শিকার হচ্ছেন মূলত স্বাধীন ও ছোট পাম্প মালিকেরা, যারা ইতিমধ্যেই সীমিত লভ্যাংশে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। লোকসান এড়াতে অনেক স্টেশন এখন উন্নত সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ (ANPR) প্রযুক্তি এবং তেল নেওয়ার আগেই টাকা পরিশোধ বা ‘পে-অ্যাট-দ্য-পাম্প’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করতে শুরু করেছে। তবে এই প্রযুক্তিগুলো স্থাপন করাও বেশ ব্যয়বহুল।
যুক্তরাজ্যের পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, চুরির এমন হাজার হাজার ঘটনার তদন্ত করা তাদের সীমিত জনবলের কারণে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ এসব ঘটনাকে দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি বা প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে যুক্তরাজ্যের খুচরা জ্বালানি শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
