মোহাম্মদ আল ফায়েদের নির্যাতনের শিকার অন্তত ৫ জন পেলেন ‘আধুনিক দাসত্ব’-এর স্বীকৃতি
যুক্তরাজ্যের বিতর্কিত প্রয়াত ধনকুবের মোহাম্মদ আল ফায়েদের দ্বারা যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া অন্তত পাঁচজন নারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আধুনিক দাসত্ব’ (মডার্ন স্লেভারি)-এর শিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই নারীদের পাচারের শিকার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আল ফায়েদের বিরুদ্ধে ওঠা দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে আরও জোরালো করেছে। লন্ডনের বিখ্যাত হ্যারডস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সাবেক এই মালিকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তরুণীদের শোষণ ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ভুক্তভোগী নারীদের কয়েকজনকে আন্তর্জাতিকভাবে এবং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে পাচার করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেখা গেছে, সম্পূর্ণ অপরাধমূলক কার্যক্রমটি লন্ডনের বিলাসবহুল হ্যারডস শপিং মলের ভেতরেই সংঘটিত হয়েছিল। আল ফায়েদ তাঁর বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এবং হ্যারডসের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ব্যবহার করে তরুণী ও নারীদের ফাঁদে ফেলতেন এবং তাঁদের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
মোহাম্মদ আল ফায়েদ ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই হ্যারডসের শত শত সাবেক নারী কর্মী তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সামনে আসতে শুরু করেন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একটি গণমাধ্যমের তথ্যচিত্রে এই অন্ধকার অধ্যায়টি বিস্তারিতভাবে উঠে আসার পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, আল ফায়েদ তরুণীদের ব্যক্তিগত সহকারী বা অন্য কোনো লোভনীয় পদের প্রলোভন দেখিয়ে চাকরি দিতেন এবং পরবর্তীতে তাঁদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতেন।
যুক্তরাজ্যের আইনি ও সরকারি নিয়মানুযায়ী, আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমাণিত হয় যে, ভুক্তভোগীদের কেবল ব্যক্তিগতভাবে হেনস্থা করা হয়নি, বরং তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রেখে, ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়েছিল। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যারডসের মতো একটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ভেতরে এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়া এবং বছরের পর বছর ধরে তা ধামাচাপা থাকা চরম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও অবহেলার বহিঃপ্রকাশ।
ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি নির্যাতিত নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক। হ্যারডসের বর্তমান মালিকপক্ষ ইতিমধ্যেই এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে আইনজীবীদের দাবি, এই আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে হ্যারডসের নিরাপত্তা কর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ আল ফায়েদের এই জঘন্য অপরাধের সহযোগী বা নীরব দর্শক ছিল। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে ভুক্তভোগী নারীরা আইনি সহায়তার পাশাপাশি নতুন করে জীবন গড়ার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
