কুয়াকাটায় জেলের জালে বিরল ‘লাইন্ড সার্জন ফিশ’: কেন এই মাছটি বিশেষ?
বঙ্গোপসাগরের গভীর জলরাশিতে ধরা পড়েছে অত্যন্ত বিরল প্রজাতির এক সামুদ্রিক মাছ, যা স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলের অদূরে জেলেদের জালে আটকা পড়া এই মাছটির নাম ‘লাইন্ড সার্জন ফিশ’। হলুদ, নীল ও কালো রঙের অদ্ভুত সুন্দর ডোরাকাটা এই মাছটি স্থানীয়ভাবে ‘সুন্দরী মাছ’ হিসেবেও পরিচিত। রোববার সকালে আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ‘সিফাত ফিশ’ আড়তে মাছটিকে নিয়ে আসার পর এর সৌন্দর্য দেখতে ভিড় জমান উৎসুক মানুষ।
মাছটির বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন ট্রলারের মাঝি মো. সেলিম মিয়া। তিনি জানান, শনিবার গভীর রাতে মাছ ধরার সময় অন্য মাছের সঙ্গে এটি জালে আটকা পড়ে। দীর্ঘদিনের মৎস্য শিকারের অভিজ্ঞতায় তিনি এমন রঙিন ও আকর্ষণীয় মাছ আগে কখনো দেখেননি। মাছটির বাণিজ্যিক চাহিদা খুব একটা না থাকলেও, এর অনন্য রূপের কারণে এটি বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আড়তদার মো. মিজানুর রহমান।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী মাছটির বৈজ্ঞানিক পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এটি অ্যাকানথুরিডি (Acanthuridae) পরিবারের সদস্য, যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যাকানথুরাস লিনিয়েটাস’ (Acanthurus lineatus)। মাছটির শরীরের উজ্জ্বল বর্ণবিন্যাস এবং অর্ধচন্দ্রাকার লেজ একে অন্যান্য প্রজাতি থেকে আলাদা করে তুলেছে। মাছটির লেজের গোড়ায় ধারালো বিষাক্ত কাঁটা থাকে, যা অনেকটা শল্যচিকিৎসকের ছুরির মতো। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই একে ‘সার্জন ফিশ’ বলা হয়। প্রজাতিটি সাধারণত ৩৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং আইইউসিএন-এর তালিকায় এটি বর্তমানে ‘ন্যূনতম উদ্বেগজনক’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।
কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা এই মাছের নিরাপত্তা ও সতর্কতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, মাছটির লেজের গোড়ায় থাকা কাঁটাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। আত্মরক্ষার জন্য মাছটি এই কাঁটা ব্যবহার করে, যা মানুষের শরীরে আঘাত করলে অসহ্য যন্ত্রণার সৃষ্টি হতে পারে। যদিও বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন ও সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় মাঝেমধ্যে এদের দেখা পাওয়া যায়, তবে কুয়াকাটা সংলগ্ন এলাকায় এমন মাছ পাওয়ার ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এই নিদর্শনটি উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে নতুন করে গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
