সেউটা অভিবাসন সংকট: ইতালির শেনজেন স্থগিতাদেশে স্পেনের ‘স্বার্থপর’ ইইউ প্রতিক্রিয়ার নিন্দা

সেউটা অভিবাসন সংকট: ইতালির শেনজেন স্থগিতাদেশে স্পেনের ‘স্বার্থপর’ ইইউ প্রতিক্রিয়ার নিন্দা

ভূমধ্যসাগরের স্প্যানিশ ছিটমহল সেউটায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ব্যাপক আগমনকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির ‘আশঙ্কাজনক’ মন্তব্যের পর স্পেন থেকে শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইতালি। এই পদক্ষেপ এবং কিছু ইউরোপীয় দেশের সামগ্রিক প্রতিক্রিয়াকে ‘স্বার্থপর’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে স্পেন। এটি ইইউ-এর মধ্যে অভিবাসন নীতি এবং সংহতির দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে।

সেউটা এবং এর পার্শ্ববর্তী স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলা মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত, যা আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের প্রধান স্থলপথ। ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত হলেও এগুলি স্পেনের অংশ, এবং এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও বাহ্যিক সীমান্ত হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক সময়ে, হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী, যাদের অধিকাংশই সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে এসেছেন, মরক্কো থেকে কাঁটাতার ও বেড়া ডিঙিয়ে বা সমুদ্রপথে সেউটা ও মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন। মানবিক এই পরিস্থিতি প্রায়শই চরম বিশৃঙ্খল ও বিপজ্জনক রূপ নেয়, যা সীমান্ত রক্ষীদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি, যিনি অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত, সেউটার পরিস্থিতিকে ‘আশঙ্কাজনক’ এবং ‘চমকে দেওয়ার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, সেউটার অভিবাসন সংকট ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে স্পেনের সাথে শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এই স্থগিতাদেশের উদ্দেশ্য হলো স্পেন থেকে অবৈধ অভিবাসীদের ইতালিতে প্রবেশ ঠেকানো এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ঝুঁকি কমানো। উল্লেখ্য, ইতালি নিজেও ভূমধ্যসাগর হয়ে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর আগমনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে এবং এই ইস্যুতে অন্যান্য ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ার অভিযোগ করে থাকে।

স্পেন অবশ্য এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলির ‘স্বার্থপর’ মনোভাবের নিন্দা জানিয়েছে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন, অভিবাসন সমস্যা একটি সামগ্রিক ইউরোপীয় চ্যালেঞ্জ এবং এর মোকাবিলায় সব সদস্য রাষ্ট্রের একযোগে কাজ করা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন যে, কিছু দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সংহতি প্রকাশে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সীমান্ত রাষ্ট্রগুলির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এই ধরনের একক পদক্ষেপ ইইউ-এর মূলনীতি, অর্থাৎ সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অবাধ চলাচল এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকে খর্ব করে।

শেনজেন চুক্তি ইউরোপের ২৬টি দেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে অবাধ চলাচলের অনুমতি দেয়, যা ইইউ সংহতির একটি প্রতীক। যখন কোনো সদস্য রাষ্ট্র জরুরি পরিস্থিতিতে এই চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করে, তখন তা কেবল কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে না, বরং সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও জটিলতা তৈরি করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, অভিবাসন সংকটের মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইইউ-এর অভ্যন্তরীণ ঐক্য মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ঘটনা ইউরোপের অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিভেদকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইইউ দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিন্ন এবং কার্যকরী অভিবাসন নীতি প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছে, যেখানে সীমান্ত রাষ্ট্রগুলির বোঝা ভাগ করে নেওয়ার একটি ন্যায্য ব্যবস্থা থাকবে। ইতালির পদক্ষেপ এবং স্পেনের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, এই বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে এখনও গভীর মতানৈক্য বিদ্যমান। এই কূটনৈতিক বিবাদ ভবিষ্যতে ইইউ-এর সংহতি এবং এর সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply