বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে সমালোচনার সুর শোনা গেল বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের কণ্ঠে। তিনি এই শাসনব্যবস্থাকে ‘পিওরলি’ বা পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একটি সাম্প্রতিক আলোচনায় তিনি দাবি করেন, এই ব্যবস্থা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো টেকসই সমাধান নয়, বরং এটি প্রশাসনিক জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ড. ফরাসউদ্দিনের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকা উচিত। যখনই শাসনভার অনির্বাচিত বা আমলাদের হাতে ন্যস্ত করা হয়, তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা নেমে আসে। তিনি উল্লেখ করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে আমলারা পর্দার আড়াল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, যা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য সুফল বয়ে আনে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সক্ষমতা খর্ব করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সংকট নিরসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং এর পরবর্তী ঘটনাবলি এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো সামনে নিয়ে আসে। ড. ফরাসউদ্দিনের এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি মনে করেন আমলাতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে কখনোই দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। তার মতে, আমলারা সাধারণত দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে থাকতে পছন্দ করেন, যা জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে ঘটে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক চলছে। একদিকে প্রধান বিরোধী দলগুলো এই ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন দাবি করে আসছে, অন্যদিকে বর্তমান সরকার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে অনড়। এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ড. ফরাসউদ্দিনের এই কঠোর সমালোচনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে, ড. ফরাসউদ্দিনের এই মন্তব্য দেশের নীতিনির্ধারক মহল এবং সুশীল সমাজে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। তিনি বারবার গুরুত্বারোপ করেছেন যে, কোনো অগণতান্ত্রিক বা অনির্বাচিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে আরও নিবিড় ও স্বচ্ছ করার মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে আমলাতন্ত্র কেবল সহায়কের ভূমিকা পালন করবে, নিয়ন্ত্রকের নয়।
