হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের নতুন অবরোধ ঘোষণা, মার্কিন হামলার তৃতীয় রাতে ইরানের বিরুদ্ধে আমিরাতের তীব্র নিন্দা
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যে গভীর উত্তেজনা বিরাজমান ছিল, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর তৃতীয় রাতের মতো ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছিল এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর উপর একটি নতুন অবরোধের অংশ হিসেবে ২০% চার্জ আরোপের ঘোষণা করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের বিরুদ্ধে ট্যাঙ্কারগুলিতে ‘নির্লজ্জ’ হামলার তীব্র নিন্দা জানায়, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারাবাহিক সামরিক পদক্ষেপ ইরানের কথিত উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় এসেছিল। এর মধ্যে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে বেশ কয়েকটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা এবং একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা অন্যতম। ওয়াশিংটন দাবি করেছিল যে এই হামলাগুলির পেছনে ইরানের হাত ছিল, যদিও তেহরান নিয়মিতভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে ইরানের আগ্রাসন প্রতিরোধের এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছিল।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালীর উপর ‘নতুন অবরোধ’ এবং ‘২০% চার্জ’ আরোপের ঘোষণা ছিল ইরানের উপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতিরই অংশ। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই প্রণালীতে কোনো ধরনের অবরোধ বা শুল্ক আরোপের ঘোষণা বৈশ্বিক তেল বাজার এবং আন্তর্জাতিক শিপিংয়ের জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানিকে আরও সীমিত করা এবং দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা ইরানের বিরুদ্ধে তেল ট্যাঙ্কারগুলিতে ‘নির্লজ্জ’ এবং ‘উস্কানিমূলক’ হামলার জন্য কঠোর ভাষায় নিন্দা জানায়। আমিরাত সহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলি এই হামলাগুলিকে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখেছিল। এই ধরনের হামলার ফলে শিপিং কোম্পানিগুলির জন্য বীমার খরচ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, ইরান এই অভিযোগগুলি বারবার অস্বীকার করে আসছিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও অবরোধকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তেহরান জোর দিয়ে বলেছিল যে তারা তাদের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, যদি তাদের তেল রপ্তানি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে দ্বিধা করবে না, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারত।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে সরে আসার পর থেকেই ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তাদের তেল রপ্তানিকে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এই ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক মহল এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য ক্ষমতাধর দেশগুলি উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছিল। একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল। কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালানো হলেও, সে সময় উভয় পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে তা ফলপ্রসূ হয়নি। এই ঘটনাগুলি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক জটিল ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
