জেফ্রি এপস্টেইনের অন্ধকার জগত: এক ভুক্তভোগীর বয়ানে উঠে এল নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র

জেফ্রি এপস্টেইনের অন্ধকার জগত: এক ভুক্তভোগীর বয়ানে উঠে এল নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র

মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টেইনের যৌন কেলেঙ্কারি এবং তার পরিচালিত নেটওয়ার্কের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখনো চাঞ্চল্য অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ‘আনিয়া’ ছদ্মনামে এক নারী ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির কাছে তার জীবনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, এপস্টেইন তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করে কীভাবে তরুণীদের ফাঁদে ফেলতেন এবং তাদের ওপর অমানবিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতেন, তা এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন।

আনিয়ার বর্ণনায় উঠে এসেছে, এপস্টেইন মূলত তাদের ‘সহকারী’ হিসেবে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের প্রলুব্ধ করতেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের একটি নিয়ন্ত্রিত এবং ভীতিপ্রদ বলয়ের ভেতর আটকে ফেলা হতো। এপস্টেইনের এই চক্রটি ছিল অনেকটা একটি গোপন ‘কাল্ট’ বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মতো, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। তিনি কৌশলে ভুক্তভোগীদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে ফেলতেন এবং হুমকি ও ভয়ের মাধ্যমে তাদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করতেন। এমনকি অনেকের ওপর জোরপূর্বক নানাবিধ অস্ত্রোপচার বা বিকৃত সার্জারি চালানো হতো, যার মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো।

জেফ্রি এপস্টেইনের এই অপরাধী সাম্রাজ্য দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত ছিল। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং বিশ্বের নামী-দামী ব্যক্তিদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও, তিনি পর্দার আড়ালে গড়ে তুলেছিলেন এমন এক জগত যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ভুক্তভোগীদের মতে, এপস্টেইন শুধু যৌন নির্যাতনের সাথেই যুক্ত ছিলেন না, বরং তিনি সুপরিকল্পিতভাবে তাদের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। আনিয়া জানান, সেই ভয়াবহ সময় থেকে বেরিয়ে আসা ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মতো, যেখানে এখনো প্রতি মুহূর্তে সেই দুঃসহ স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

২০১৯ সালে কারাগারে থাকাকালীন জেফ্রি এপস্টেইনের রহস্যজনক মৃত্যু এবং পরবর্তীতে তার সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিচার বিশ্বজুড়ে এই কেলেঙ্কারির ব্যাপকতা সামনে নিয়ে আসে। তবে আনিয়ার মতো ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অপরাধযজ্ঞের শিকড় অনেক গভীরে। তাদের জীবনের এই অবর্ণনীয় লড়াই কেবল ন্যায়বিচারের দাবিই জানায় না, বরং শক্তিশালী ব্যক্তিদের দ্বারা সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারীদের শোষণের বিরুদ্ধে এক কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে। এই বয়ান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে, কীভাবে আইনের চোখের আড়ালে দীর্ঘ সময় এমন একটি অপরাধী নেটওয়ার্ক টিকে থাকতে পারল। আজ এত বছর পরেও আনিয়ার মতো সাহসীরা যখন মুখ খুলছেন, তখন তা সমাজে নারী ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে।