রাতের শিফটে কাজের স্বাস্থ্যঝুঁকি: অনিদ্রা দূর করে সুস্থ থাকার উপায়
আধুনিক বিশ্বের কর্মসংস্কৃতিতে রাতের শিফটে কাজ বা ‘নাইট শিফট’ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ নিয়মিত রাতে কাজ করেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও জৈবিক ঘড়িতে গভীর প্রভাব ফেলছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম অনুযায়ী রাতের সময়টি বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত। এই প্রাকৃতিক নিয়মকে উপেক্ষা করে কৃত্রিম আলোতে কাজ করা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত নাইট শিফট করেন, তাদের শরীরে কার্ডিওভাসকুলার রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার ঝুঁকি সাধারণ সময়ের কর্মীদের তুলনায় অনেক বেশি। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটা। রাতে কাজ করার ফলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং ঘুমের গুণমান অনেকাংশে কমে যায়, যা থেকে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসাদ তৈরি হয়। এছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট; অনেকেই মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মনোযোগের অভাব এবং ডিপ্রেশনের মতো সমস্যার সম্মুখীন হন।
নাইট শিফটে কর্মরত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, শিফট শেষ হওয়ার পর পর্যাপ্ত অন্ধকার এবং শীতল পরিবেশে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। ব্ল্যাকআউট কার্টেন বা আই মাস্ক ব্যবহার করে কৃত্রিম আলো থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখা যেতে পারে। এছাড়া রাতে কাজের সময় হালকা অথচ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা এবং ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় থেকে দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়।
কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে বিরতি নিয়ে হালকা ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি থেকে শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তবে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; নিয়োগকর্তাদেরও উচিত কর্মীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে শিফটের সময়সূচী নির্ধারণ করা। গবেষণায় দেখা গেছে, রোটেটিং বা পরিবর্তনশীল শিফটের চেয়ে নির্দিষ্ট নাইট শিফট শরীরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ।
পরিশেষে, রাতের শিফটে কাজ করা অনেক পেশার ক্ষেত্রেই অনিবার্য। তবে উপযুক্ত পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নাইট শিফটের নেতিবাচক প্রভাবগুলো অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে কর্মক্ষেত্রে অনিয়মিত সময়সূচীর ঝুঁকি নিয়ে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
