ফুটবলের বাইরেও অনন্য উচ্চতায় আর্জেন্টিনা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নীরব বিপ্লব
ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি বা কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনা পরিচিত হলেও, দেশটির আরেকটি পরিচয় এখন বিশ্বমঞ্চে সমান্তরালভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। শিল্প, সাহিত্য ও খেলার বাইরে আর্জেন্টিনা বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান এবং বায়োটেকনোলজির মতো উচ্চতর প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোমিঙ্গো ফাউস্তিনো সারমিয়েন্তো কর্তৃক প্রবর্তিত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশটির মেধাবী প্রজন্ম তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে। আজও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষার হারের দিক থেকে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে আর্জেন্টিনা।
বিজ্ঞান ও গবেষণায় দেশটির শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাদের অর্জিত নোবেল পুরস্কার। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী উপহার দিয়েছে। ১৯৪৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বার্নার্ডো হাউসে—যিনি ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী—থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালে রসায়নে লুইস ফেদেরিকো লেলইর এবং ১৯৮৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সিজার মিলস্টেইন বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার নামকে গৌরবান্বিত করেছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে আর্জেন্টাইন বিজ্ঞানীদের অবদান আধুনিক জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে অবিস্মরণীয়। ১৯১৪ সালে চিকিৎসক লুইস আগোতের উদ্ভাবিত নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি রক্তদান প্রক্রিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। এছাড়া হৃদ্রোগ চিকিৎসায় বাইপাস সার্জারির পথিকৃৎ রেনে ফাভালোরো এবং ১৯৬৯ সালে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড উদ্ভাবনের মাধ্যমে ডোমিঙ্গো লিওত্তা চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। আধুনিক যুগেও তারা থেমে নেই; হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের মতো জটিল গবেষণায় আর্জেন্টাইন গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
মহাকাশ প্রযুক্তি এবং পারমাণবিক শক্তির শান্তিপুর্ণ ব্যবহারে আর্জেন্টিনা ল্যাটিন আমেরিকায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মহাকাশ কার্যক্রম কমিশন (CONAE) নিজস্ব প্রযুক্তিতে আটটি স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে, যার মধ্যে এসএসি-ডি (SAC-D) এবং আরস্যাট (Arsat) সিরিজের কৃত্রিম উপগ্রহগুলো দেশটির কারিগরি সক্ষমতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাশাপাশি, ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘ইনভাপ’ (INVAP) বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক চুল্লি রপ্তানি করছে, যা দেশটির উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পের সক্ষমতাকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বর্তমানে আর্জেন্টিনা তার অর্থনীতিকে প্রথাগত খাতের বাইরে এনে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সফটওয়্যার শিল্প, মহাকাশ গবেষণা এবং উন্নত যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় দেশটির অবস্থানকে আরও মজবুত করছে। ফুটবল মাঠের জাদুকরী পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এখন ল্যাবরেটরিতেও আর্জেন্টাইনদের সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার জয়গান বিশ্ববাসী নতুন করে লক্ষ্য করছে।
