ইউরোপের অভিবাসী সংকট: মূলধারার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে কট্টর ডানপন্থীরা?

ইউরোপের অভিবাসী সংকট: মূলধারার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলছে কট্টর ডানপন্থীরা?

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে অভিবাসনপ্রত্যাশী ও শরণার্থীদের প্রবেশাধিকারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল ভূরাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক শরণার্থী সংকটের সময় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর যে মানবিক ও উদার মানসিকতা দেখা গিয়েছিল, এক দশকেরও বেশি সময় পর বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার মধ্যে একটি বড় ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। উত্তর আফ্রিকার স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের কড়া অবস্থান এবং কঠোর নীতি গ্রহণের প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, গত এক দশকে মহাদেশটির রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হয়েছে।

২০১৫ সালের সেই দিনগুলোতে সিরিয়া এবং সংঘাতকবলিত অন্যান্য অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের জন্য ইউরোপের সীমান্তগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়ার ক্ষেত্রে জার্মানি ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে সেই সময়ের উদারনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক মেরুকরণের জেরে ইউরোপের রাজনীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ডানপন্থী শক্তিগুলো ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বর্তমানে এই রাজনৈতিক দলগুলো কেবল বিরোধিতাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা ইউরোপের সামগ্রিক অভিবাসন নীতি এবং সীমান্ত সুরক্ষা কৌশল নির্ধারণে প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

স্পেনের অধীন সেউতা সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এই পরিবর্তনেরই একটি বাস্তব উদাহরণ। শত শত মানুষ যখন ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা চালায়, তখন স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর ও সুরক্ষাবাদী। অতীতে যেখানে মানবিক সহায়তা এবং আশ্রয়ের আবেদন পুনর্বিবেচনার ওপর জোর দেওয়া হতো, বর্তমানে সেখানে সীমান্ত সিলগালা করা, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি এবং পুশ-ব্যাক নীতির জোরালো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং কট্টর ডানপন্থীদের জনসমর্থন জোয়ারের মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়েই এখন এই কঠোর অভিবাসনবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করছে।

এই ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকারের ধারণার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তারা মনে করেন, অভিবাসীদের সমস্যার কাঠামোগত সমাধান না খুঁজে কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করার এই নীতি মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। আগামী দিনে ইউরোপের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থীদের আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, মহাদেশটির অভিবাসন নীতি যে আরও বেশি কঠোর ও রক্ষণশীল হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Reply