হরমুজ প্রণালি এড়াতে ভূমধ্যসাগরীয় পাইপলাইন: ইরাক-সিরিয়া ও মার্কিন নতুন কৌশল
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমাতে এক বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ইরাক, সিরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ একটি পুরোনো পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করা, যা ইরাকের কিরকুক শহর থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পরিত্যক্ত এই পাইপলাইনটি পুনরায় চালু হলে ইরাক তার তেল রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারবে।
ইরাকি সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির মধ্যে আসন্ন বৈঠকে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বড় কোম্পানির সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, বরং এটি লেভান্ট অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রভাববলয় তৈরির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
১৯৫২ সালে নির্মিত এই পাইপলাইনটি ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের ফলে এর অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাইপলাইনটি কার্যকর করতে নতুন স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, পাম্পিং স্টেশন এবং অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন পড়বে, যার জন্য দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। মার্কিন কোম্পানি ক্যাপিটাল টিআই এবং শেভরনের মতো প্রতিষ্ঠানের এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকল্পটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার শাসনামলে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বাশার আল-আসাদের পতনের পর শারা মার্কিন প্রশাসনের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা এই পাইপলাইন প্রকল্পের আইনি ও ব্যবসায়িক জটিলতা নিরসনে সহায়ক হবে। তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থিত এই নতুন সিরীয় সরকার এখন ইরাকের জ্বালানি রপ্তানির জন্য একটি নিরাপদ রুট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া।
ইরাকের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তেল রপ্তানি, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তবে ইরানের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের কারণে মাঝেমধ্যেই এই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বাধার মুখে ইরাকের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যা দেশটির জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, ভূমধ্যসাগরের দিকে মুখ করা এই পাইপলাইন ইরাকের জন্য কেবল বিকল্প পথ নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
