ফুটবলের ম্যাচসেরা পুরস্কার কি এখন যোগ্যতার চেয়ে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি?

ফুটবলের ম্যাচসেরা পুরস্কার কি এখন যোগ্যতার চেয়ে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি?

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ বা বর্তমানের ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কারটি একসময় ছিল মাঠের পারফরম্যান্সের অনন্য স্বীকৃতি। ২০০২ সালে ফিফা যখন প্রথম এই প্রথা চালু করে, তখন এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ফুটবল বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ। ফিফার ‘টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’-এর অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করে যোগ্য ব্যক্তিকে এই সম্মাননা প্রদান করতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ধারা থেকে সরে এসে ফিফা এখন জনমতের ওপর ভিত্তি করে এই পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে শুরু হওয়া এই অনলাইন ভোটিং পদ্ধতি বর্তমানে পুরস্কারটির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় গ্যালারিতে থাকা দর্শক কিংবা ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সমর্থকরা মুঠোফোন বা অনলাইনের মাধ্যমে তাদের পছন্দের খেলোয়াড়কে ভোট দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার ফলে ফুটবলের বাস্তব পরিসংখ্যান বা কৌশলগত অবদানের চেয়ে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বা জনপ্রিয়তাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, মাঠজুড়ে দুর্দান্ত লড়াই করা একজন ফুটবলারের চেয়ে জনপ্রিয় কোনো মহাতারকা গোল না করেও বা আহামরি কোনো পারফরম্যান্স না দেখিয়েই ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নিচ্ছেন। কেভিন ডি ব্রুইনা বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো তারকারাও অতীতে এই পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে নিজেদের বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, যা এই ব্যবস্থার অসংগতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

চলমান বিশ্বকাপেও এই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। লিওনেল মেসি বা জুড বেলিংহামের মতো তারকারা সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিয়মিত এই পুরস্কার পাচ্ছেন, কিন্তু তাদের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ বা ঘানার রক্ষণভাগের মতো খেলোয়াড়দের অসামান্য পরিশ্রম। পরিসংখ্যান বলছে, মেসি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৫ বার এই পুরস্কার জিতেছেন, যা তার বিশাল জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায়, ফুটবলের মতো একটি টেকনিক্যাল খেলায় যেখানে প্রতিটি পাস, ট্যাকল এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে আবেগের ভিত্তিতে পুরস্কার প্রদান কতটা যৌক্তিক?

বিশ্লেষকদের মতে, এই জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা ফুটবলারদের মনেও এক ধরনের অনীহা তৈরি করছে। ল্যামিনে ইয়ামাল বা মালিক টিলম্যানের মতো তরুণ খেলোয়াড়দের উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, তারা নিজেরাও হয়তো জানেন এই পুরস্কার অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রকৃত পারফরম্যান্সের চেয়ে জনপ্রিয়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফুটবলপ্রেমীদের মতে, যদি এই পুরস্কারের মর্যাদা বজায় রাখতে হয় এবং একে ফুটবলের প্রকৃত সম্মাননা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে আবারও বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বিচার বিশ্লেষণ এবং মাঠের পারফরম্যান্সকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা জরুরি। অন্যথায়, ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পদকটি কেবলই একটি বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তার স্মারক হয়েই থেকে যাবে।