আলোচনা না হলে ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের, পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা তুঙ্গে

আলোচনা না হলে ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের, পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা তুঙ্গে

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ব্যর্থ হলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। এই কঠোর হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এসেছিল যখন দুই দেশের মধ্যে টানা চতুর্থ দিনের মতো পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা চলছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছিল। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল এবং বিশ্বজুড়ে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে এই ধরনের কঠোর সামরিক হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে একটি নতুন, আরও বিস্তৃত চুক্তিতে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। ট্রাম্প বিশ্বাস করতেন যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সরাসরি সামরিক হুমকির মাধ্যমেই ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব। তবে, অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং সমালোচক এই কৌশলকে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে বলে অভিহিত করেছিলেন, যা অগণিত বেসামরিক মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারতো।

টানা চার দিনের পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা বলতে সাধারণত পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ছোট আকারের নৌ-সংঘর্ষ, ড্রোন ভূপাতিত করা বা গুপ্ত হামলাকে বোঝানো হয়। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কানি এবং আগ্রাসনের অভিযোগ এনেছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। একই সময়ে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের ফলে দেশটির তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। এটি ছিল ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ, যার ফলে দেশটির রাজস্ব আয় কমে গিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও তেলের দামের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক বহু দশক ধরেই বৈরী। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা চলে আসছে। ২০১৫ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের যে পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন বা জেসিপিওএ) হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে তা থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে আসে। এরপরই ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করা হয়, যা ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি নামে পরিচিতি লাভ করে। ইরান এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখেছিল, যা উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ট্রাম্পের এই ধরনের সরাসরি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছিলেন যে, এমন একটি সামরিক পদক্ষেপ কেবল ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ ও বিস্তৃত সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সেতুতে হামলা হলে অগণিত বেসামরিক মানুষ বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো, যা মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারতো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয় পক্ষকেই সংযম প্রদর্শনের এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি না পায়।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী করতে পারে। ইরানের বন্দর অবরোধ এবং পারস্য উপসাগরে সামরিক তৎপরতা কেবল জ্বালানি সরবরাহকেই নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকেও গুরুতর হুমকির মুখে ফেলেছিল। তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে হামলা বা সমুদ্রপথে অবরোধের ঘটনা বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতো।

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে আলোচনার জন্য শর্ত দিয়েছিল যে ইরানকে প্রথমে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে হবে এবং আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছিল যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরে আসতে হবে। এই অনমনীয় অচলাবস্থা কূটনৈতিক সমাধানের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছিল এবং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অটল ছিল।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের কঠোর হুমকি এবং ইরানের পাল্টা প্রতিরোধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিল। সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ববাসী উদ্বিগ্ন ছিল এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে, উভয় পক্ষের অনমনীয় মনোভাব সংঘাতের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল এবং অঞ্চলটিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।