জাতিসংঘে আইরিন খানের নিয়োগ: বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা

জাতিসংঘে আইরিন খানের নিয়োগ: বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানের নিয়োগকে দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কিছু নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে আইরিন খানের এই নিয়োগ দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও নৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।

আইরিন খান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তিনি বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রথম নারী মহাসচিব এবং পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশনের (আইডিএলও) প্রধান হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ২০২০ সালে তাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার সপক্ষে তার জোরালো কণ্ঠস্বর সবসময়ই প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তার মতো একজন যোগ্য ও পরিচিত ব্যক্তিত্বের অন্তর্ভুক্তি বৈশ্বিক দরবারে দেশের কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা বা ‘ভিজিবিলিটি’ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

বাংলাদেশে বিগত সরকারের আমলে মানবাধিকারের চরম বিপর্যয় ঘটেছিল। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের মতো ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছিল। আইরিন খান নিজেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এমনকি নতুন সরকারের সময় সংবাদমাধ্যমের ওপর মব আক্রমণের ঘটনা ঘটলে তিনি তার কঠোর সমালোচনা করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার তাগিদ দিয়েছিলেন। মানবাধিকার নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী প্রশ্ন রয়েছে, তখন আইরিন খানের মতো একজন আপসহীন মানবাধিকার কর্মীকে স্থায়ী প্রতিনিধি করার সিদ্ধান্তকে সরকারের একটি সাহসী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে ক্ষমতার বাইরে থেকে একজন স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে কথা বলা এবং সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। আইরিন খানের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা হবে যে, তিনি কীভাবে সরকারের নীতি সমর্থন করার পাশাপাশি মানবাধিকারের মূল নীতিগুলোর প্রতি নিজের অঙ্গীকার বজায় রাখেন। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বিতর্কিত আইনগুলোর অপব্যবহার রোধে এবং দেশের ভেতর মানবাধিকারের সার্বিক উন্নয়নে তার ভূমিকা কী হবে, তা দেখার বিষয়।

রোহিংগা সংকট সমাধান, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের গুরুত্ব অপরিসীম। কাকতালীয়ভাবে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আইরিন খানের মতো একজন বিশ্বমানের ব্যক্তিত্বের জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন দেশের কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং বৈশ্বিক দরবারে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।