জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের মরদেহ ঢাকার একটি হাসপাতাল থেকে পার্শ্ববর্তী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, এই অমানবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সকল ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। এই অভিযোগটি জুলাই মাসের ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘাতে নিহতদের দেহাবশেষের মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বুধবার রাজধানীর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান সংলগ্ন জুলাই শহীদদের গণকবর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই তথ্য প্রকাশ করেন। প্রসিকিউশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রায়েরবাজারের ওই গণকবরে মোট ১১৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন জুলাই শহীদের পরিচয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সময়সাপেক্ষ একটি কাজ।
তদন্তের গভীরে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, তারা জানতে পেরেছেন যে, ঢাকার নিকটবর্তী একটি নদী থেকে একটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল থেকে অসংখ্য মরদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই হাসপাতালের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এবং যারা এই জঘন্য কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের সকলকেই শনাক্ত করার জোর চেষ্টা চলছে। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দোষীদের দ্রুততম সময়ে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে যেসব মরদেহের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোর পরিচয়ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে সারাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এই বিশাল সংখ্যক হতাহতের প্রেক্ষাপটে, প্রতিটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাদের পরিবারকে তথ্য জানানোর গুরুত্ব অপরিসীম। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তাদের তদন্তের অংশ হিসেবে তারা রায়েরবাজারের গণকবর পরিদর্শন করেছেন এবং এ পর্যন্ত ৮৩৪ জন জুলাই শহীদের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, এখনো বহু মরদেহ শনাক্তকরণের বাইরে রয়েছে।
তদন্তের পরিধি কেবল রায়েরবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, রায়েরবাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত অন্যান্য গণকবর যেমন জুরাইন, মাতুয়াইল, নারায়ণগঞ্জ এবং মুন্সিগঞ্জের গণকবরগুলোও পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করা হবে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো মৃতদেহ শনাক্তকরণে নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে এবং শোকাহত পরিবারগুলোকে তাদের প্রিয়জনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ দেবে।
এই ঘটনা কেবল একটি অপরাধের তদন্ত নয়, বরং এটি মানবতাবিরোধী একটি জঘন্য কাজের বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা। গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তবে এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে এই তদন্ত প্রক্রিয়া একদিকে যেমন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে যে, কোনো অপরাধই পার পাবে না এবং প্রতিটি জীবনই মূল্যবান। এই তদন্তের মাধ্যমে নিহতদের পরিবারগুলো আশা করছে যে, তারা তাদের প্রিয়জনের পরিণতি সম্পর্কে সত্য জানতে পারবে এবং দোষীরা তাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করবে।
