কেন কমছে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব? প্রযুক্তির আগ্রাসনে হারানো একাগ্রতা ফেরানোর উপায়

কেন কমছে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব? প্রযুক্তির আগ্রাসনে হারানো একাগ্রতা ফেরানোর উপায়

আধুনিক বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করলেও, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মানব মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ গড়ে প্রায় দুই মিনিট কমেছে। ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন নোটিফিকেশন এবং মাল্টি-টাস্কিংয়ের প্রবণতা আমাদের মনোযোগকে খণ্ডিত করে ফেলছে। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন—সব জায়গাতেই এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘক্ষণ কোনো কাজে নিবিড়ভাবে ডুবে থাকার সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে উৎপাদনশীলতা এবং মানসিক প্রশান্তি উভয়ই ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রযুক্তির নিরন্তর সরবরাহ আমাদের মস্তিস্ককে সবসময় নতুন উদ্দীপনার খোঁজে অভ্যস্ত করে তুলেছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ক্রমাগত স্ক্রলিং এবং মুহূর্তের মধ্যে এক অ্যাপ থেকে অন্য অ্যাপে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের মস্তিস্কের ‘ডোপামিন লুপ’-কে প্রভাবিত করে। এর ফলে গভীর চিন্তাভাবনা বা দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের দিকে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। কর্মক্ষেত্রে কর্মীরা যখনই কোনো জটিল কাজ শুরু করেন, তখনই ইমেইল বা মেসেজিং অ্যাপের সতর্কবার্তা তাদের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এটি কেবল সময়ের অপচয়ই নয়, বরং কাজের গুণগত মানকেও কমিয়ে দিচ্ছে। গবেষকদের মতে, একবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলে আবার মূল কাজে ফিরে আসতে একজন মানুষের মস্তিস্কের গড়ে ২৩ মিনিট পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা বেশ কিছু কার্যকর কৌশলের কথা বলেছেন। প্রথমত, ‘ডিপ ওয়ার্ক’ বা গভীর মনোনিবেশের সময় নির্ধারণ করা জরুরি। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ছাড়া কেবল একটি একক কাজে ব্যয় করলে মনোযোগের শক্তি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, মাল্টি-টাস্কিংয়ের কুফল সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একসাথে অনেক কাজ করার চেয়ে একটি কাজ শেষ করে অন্যটিতে হাত দেওয়া মস্তিস্কের কার্যকারিতা বাড়ায়। এছাড়া, নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান চর্চা মনোযোগের গভীরতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

পরিশেষে, প্রযুক্তির সাথে আমাদের সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি। ডিজিটাল ডিটক্স বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ডিভাইস থেকে দূরে থাকা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। মনোযোগ কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়, বরং এটি একটি দক্ষতা যা সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে পুনরায় অর্জন করা সম্ভব। ব্যস্ত এই যুগে স্থির থাকা বা একাগ্রতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হলেও, সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা আমাদের মনোযোগের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারি।