ব্রিটিশ স্টিলের মালিকানা এখন সরকারের হাতে: স্কানথর্প স্টিলওয়ার্কস জাতীয়করণে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

ব্রিটিশ স্টিলের মালিকানা এখন সরকারের হাতে: স্কানথর্প স্টিলওয়ার্কস জাতীয়করণে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

যুক্তরাজ্যের শিল্প ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ব্রিটিশ স্টিলকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া বিশেষ ক্ষমতার আওতায় দেশটির অন্যতম বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘স্কানথর্প স্টিলওয়ার্কস’ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয়করণ করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কয়েক দশকের বেসরকারি মালিকানা ও নানা সংকটের পর সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ব্রিটিশ শিল্প খাতের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ স্টিল আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং মালিকানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে উত্তর লিংকনশায়ারের স্কানথর্প ভিত্তিক এই স্টিল প্ল্যান্টটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হাজার হাজার শ্রমিকের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছিল। বর্তমান সরকারের এই কঠোর হস্তক্ষেপের ফলে কেবল ৪ হাজার সরাসরি কর্মসংস্থানই রক্ষা পাবে না, বরং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিশাল সাপ্লাই চেইনের কয়েক হাজার শ্রমিকের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা নিশ্চিত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ইস্পাত শিল্পের স্বনির্ভরতা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই জাতীয়করণ প্রক্রিয়াটি কেবল একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির এক বিশাল বিচ্যুতি। আশির দশকে মার্গারেট থ্যাচারের শাসনামলে ব্রিটিশ স্টিলকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাতের দামের অস্থিরতা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের বিশাল খরচ মেটাতে বেসরকারি মালিকরা হিমশিম খাচ্ছিল। বিশেষ করে চীনা মালিকানাধীন জিংয়ে গ্রুপের সাথে আলোচনার অচলাবস্থার পর সরকার এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

নতুন এই পরিকল্পনার আওতায় ব্রিটিশ সরকার স্কানথর্প স্টিলওয়ার্কসের আধুনিকায়নে বড় ধরনের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। মূলত কয়লাভিত্তিক ব্লাস্ট ফার্নেস থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব ‘ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস’ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্রিটেন তার কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি এই উদ্যোগকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো স্বাগত জানালেও বিরোধী দলগুলো এবং কিছু অর্থনীতিবিদ করদাতার অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সরকারের দাবি, ইস্পাত শিল্পকে ধ্বংস হতে দেওয়া মানে যুক্তরাজ্যের উৎপাদনশীল খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ভবিষ্যতে এই জাতীয়করণ প্রক্রিয়া অন্যান্য সংকটাপন্ন শিল্প খাতের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে আপাতত স্কানথর্পের আকাশে উত্তপ্ত আগুনের শিখা এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মব্যস্ততা বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিয়ে ব্রিটিশ সরকার তার শিল্প কৌশলে এক নতুন এবং সাহসী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।