কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে কিউবার প্রখ্যাত ভিন্নমতালম্বী ও শিল্পী আলকান্তারা

কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে কিউবার প্রখ্যাত ভিন্নমতালম্বী ও শিল্পী আলকান্তারা

কিউবার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ভিন্নমতালম্বী, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ও পারফর্মিং শিল্পী লুইস ম্যানুয়েল ওতেরো আলকান্তারা অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে পাড়ি জমিয়েছেন। ২০২১ সালে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ঐতিহাসিক বিক্ষোভের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর কিউবার কঠোর নিরাপত্তা ঘেরা কারাগারে বন্দি জীবন কাটানোর পর তিনি মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেলেন, তবে এর বিনিময়ে তাঁকে চিরতরে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার শর্ত মেনে নিতে হয়েছে। আলকান্তারার এই নির্বাসন কিউবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিকে পুনরায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওতেরো আলকান্তারা ছিলেন কিউবার স্বাধীন শিল্পীদের জোট ‘সান ইসিদ্রো আন্দোলন’ (Movimiento San Isidro – MSI)-এর অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা এবং চালিকাশক্তি। এই আন্দোলনটি মূলত কিউবা সরকারের বিতর্কিত ‘ডিক্রি ৩৪৯’ আইনের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল, যা সরকারি অনুমোদন ছাড়া যেকোনো ধরণের শিল্পকলা প্রদর্শন ও প্রকাশের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। আলকান্তারা এবং তাঁর সহযোগীরা এই আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও শিল্পভিত্তিক প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে কিউবার তরুণ সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন।

২০আইএল সালের ১১ জুলাই কিউবায় কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অগ্নিমূল্য, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার চরম সংকটের কারণে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে স্লোগান দেয়। এই আন্দোলনটি কিউবান প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিক্ষোভ শুরুর প্রথম দিনই আলকান্তারাকে সমাবেশস্থলে যাওয়ার পথে আটক করে দেশটির রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। পরবর্তীতে ২০২২ সালের জুন মাসে কিউবার একটি আদালত আলকান্তারাকে রাষ্ট্রীয় প্রতীক অবমাননা, গণশৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অবমাননার সাজানো অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।

গুয়ানাহাই শহরের একটি উচ্চ-নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে দীর্ঘ বন্দি জীবন কাটানোর সময় আলকান্তারার ওপর নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবুও তিনি দমে যাননি; কারাগারে থাকাকালীন সময়েও তিনি প্রশাসনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে একাধিকবার অনশন কর্মসূচি পালন করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠন তাঁকে ‘বিবেকের বন্দি’ বা ‘প্রিজনার অব কনসায়েন্স’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বৈশ্বিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার কমিউনিস্ট প্রশাসন দীর্ঘকাল ধরেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, লেখক, সাংবাদিক ও ভিন্নমতালম্বীদের নিষ্ক্রিয় করতে এক বিশেষ নিপীড়নমূলক কৌশল ব্যবহার করে আসছে। তারা প্রথমে প্রতিবাদীদের দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেয় এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাদের মুক্তির শর্ত হিসেবে দেশত্যাগে বা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। আলকান্তারার ক্ষেত্রেও একই নির্মম সত্য প্রতিফলিত হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পরপরই তাঁকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পৌঁছানোর পর আলকান্তারার সমর্থক এবং কিউবান প্রবাসীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, এভাবে কিউবান সরকার দেশের ভেতর থেকে সমস্ত ভিন্নমত দূর করার চেষ্টা করছে। আলকান্তারার এই নির্বাসনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কিউবায় মুক্ত চিন্তার অধিকার কতটা সংকুচিত। তা সত্ত্বেও, ওতেরো আলকান্তারার সহযোগীদের বিশ্বাস, দেশের বাইরে নির্বাসিত হলেও তিনি কিউবার নির্যাতিত মানুষের পক্ষে এবং স্বাধীনতার দাবিতে তাঁর শৈল্পিক ও রাজনৈতিক লড়াই বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে চালিয়ে যাবেন।

Leave a Reply