জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও অর্জনকে এ দেশে যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের এই মহান অর্জন যদি নস্যাৎ হয়ে যায়, তবে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবিচার করা হবে। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা রুখে দিতে দেশের সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ওলামায়ে কেরামের অবদান’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক এই উপদেষ্টা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
বক্তব্যে আ ফ ম খালিদ হোসেন তাঁর মেয়াদে গৃহীত আইনি সংস্কারের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার্থে এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশকে চূড়ান্তভাবে আইনে রূপান্তর করেছে। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি অধ্যাদেশ এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ঝুলে থাকা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সংস্কার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার মতো অতি সংবেদনশীল ও মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশে কখনো আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
গত বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করে সাবেক উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। কোনো সংসদ ছিল না, সরকার ছিল না, এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতিতে অনেক থানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশ সদস্যরা যখন কর্মবিরতিতে ছিলেন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক দায়িত্ব পালন করে দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল। তিনি আরও বলেন, বিগত ১৮ মাস তাঁরা দেশের স্বার্থে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সরকারি গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়লেও তাঁরা ক্ষমতার কোনো মোহ বা স্বাদ গ্রহণ করেননি, বরং একে পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অসুস্থতা ও অস্ত্রোপচারের ধকল নিয়েও তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা সফর করেছেন, শহীদদের কবর জিয়ারত করেছেন এবং আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।
বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও বিভেদের তীব্র সমালোচনা করে আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়লে তার সুযোগ নিতে পারে কোনো ‘তৃতীয় শক্তি’। পানি ঘোলা করে ফায়দা লোটার চেষ্টা সবসময়ই থাকে, তাই যেকোনো মূল্যে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় ও ধর্মীয় স্বার্থে রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার মানসিকতা বজায় রাখার তাগিদ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বিগত সরকারের আমলে আলেম-ওলামাদের ওপর চলা দীর্ঘদিনের জুলুম-নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত দিনে দাড়ি, টুপি ও সুন্নতি পোশাক পরার কারণে বহু যোগ্য ইমাম ও খতিবকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে খুতবা দেওয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান আমাদের বিভাজনের নয়, বরং আলেম সমাজের বৃহত্তর ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছে। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী বলেন, এই ৩৬ দিনের গণ-অভ্যুত্থান হঠাৎ করে হয়নি। এর পেছনে বিগত ১৫ বছর ধরে আলেম-ওলামা ও রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও জনসচেতনতা কাজ করেছে।
তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতি কাজী ইব্রাহীম, সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখের মহাসচিব মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানীসহ শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজ। বক্তারা সকলেই দেশে ইসলামি মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
