নবায়নযোগ্য শক্তি সংরক্ষণে বিপ্লব: বেলফাস্টের গবেষকদের ত্রিমাত্রিক (৩ডি) প্রিন্টেড ব্যাটারি আবিষ্কার

নবায়নযোগ্য শক্তি সংরক্ষণে বিপ্লব: বেলফাস্টের গবেষকদের ত্রিমাত্রিক (৩ডি) প্রিন্টেড ব্যাটারি আবিষ্কার

নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে এই সবুজ বিপ্লবের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো উৎপাদিত শক্তির কার্যকর সংরক্ষণ বা স্টোরেজ। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব উৎসগুলো থেকে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয় না। ফলে, যখন প্রখর সূর্যালোক বা তীব্র বাতাস থাকে, তখন উৎপন্ন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভবিষ্যতের ব্যবহারের জন্য ধরে রাখার প্রযুক্তি অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় গতি আনতে সক্ষম এমন এক নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন যুক্তরাজ্যের উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্ট’-এর একদল গবেষক। তারা তৈরি করেছেন একটি বিশেষ ধরনের ত্রিমাত্রিক বা ‘৩ডি-প্রিন্টেড’ ব্যাটারি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সাধারণত প্রচলিত ব্যাটারি উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে পরীক্ষাগারে নতুন কোনো প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য নতুন মডেল বা প্রোটোটাইপ তৈরি করতে গবেষকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কুইন্স ইউনিভার্সিটির এই নতুন গবেষণা অনুযায়ী, ৩ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির সাহায্যে এখন অত্যন্ত দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং নিখুঁতভাবে ব্যাটারির বিভিন্ন জটিল অবয়ব ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি মূলত একটি ‘ফ্লো ব্যাটারি’ (তরল প্রবাহভিত্তিক ব্যাটারি) ডিজাইনের অন্তর্ভুক্ত। ফ্লো ব্যাটারিগুলো সাধারণত বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎ গ্রিডে দীর্ঘস্থায়ী শক্তি সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়। ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ বা ৩ডি প্রিন্টিং ব্যবহারের ফলে এই ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রফল বা সারফেস এরিয়াকে নিজেদের ইচ্ছেমতো নিখুঁতভাবে নকশা করা যায়, যা ব্যাটারির সামগ্রিক শক্তি ঘনত্ব এবং কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই নবতর প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা এবং দ্রুত উৎপাদন ক্ষমতা। গবেষকরা এখন বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান, পরিবেশবান্ধব তরল এবং উদ্ভাবনী জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করে খুব সহজেই নতুন নতুন ব্যাটারি প্রোটোটাইপ প্রস্তুত ও পরীক্ষা করতে পারবেন। এর ফলে অতীতে যে ব্যাটারি তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পার হয়ে যেত, তা এখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। ফলে সামগ্রিক ব্যাটারি প্রযুক্তির গবেষণার গতি কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যা বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করবে।

বিদ্যুৎ গ্রিডে যখন নবায়নযোগ্য শক্তির সংযুক্তি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, তখন এই ধরনের সাশ্রয়ী ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টোরেজ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাতে যখন সূর্যের আলো থাকে না কিংবা শান্ত আবহাওয়ায় যখন বাতাস চলাচল থমকে যায়, তখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি বড় ধরণের ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে। এটি শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থায়িত্বই বাড়াবে না, বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার তীব্র তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, তখন বেলফাস্টের গবেষকদের এই উদ্ভাবনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৩ডি প্রিন্টেড ব্যাটারির এই সফল পরীক্ষা আগামী দিনে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে ভারী যানবাহন এবং গৃহস্থালির বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এক টেকসই ও নির্ভরযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে ব্যাটারির উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের পথকে আরও মসৃণ ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী করে তুলবে।

Leave a Reply