ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফ্যান্টিনোর নেতৃত্বে আস্থা হারালো উয়েফা: এক দশকের প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতা

ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফ্যান্টিনোর নেতৃত্বে আস্থা হারালো উয়েফা: এক দশকের প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতা

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা সম্প্রতি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনোর নেতৃত্ব নিয়ে গভীর অনাস্থা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে ফিফার সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হওয়ার সময় ইনফ্যান্টিনো যে সকল প্রতিশ্রুতির কথা বলেছিলেন, তা পূরণ করতে তিনি ‘ব্যর্থ’ হয়েছেন। এই ঘোষণা বৈশ্বিক ফুটবল প্রশাসনে ফিফা এবং উয়েফার মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনাকে আরও প্রকট করে তুলেছে এবং ইনফ্যান্টিনোর নেতৃত্বাধীন ফিফার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটারের পদত্যাগের পর ফিফার দুর্নীতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনো সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি ফুটবলের সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এক নতুন যুগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। উয়েফার মূল অভিযোগ হলো, ইনফ্যান্টিনোর এই দীর্ঘ মেয়াদের নেতৃত্বে সেই সকল মৌলিক প্রতিশ্রুতি সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বরং, বিভিন্ন সময়ে ফিফার নীতি নির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যা ইউরোপীয় ফুটবল কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

উয়েফার এই অনাস্থা প্রকাশের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে বলে ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক ম্যাচ ক্যালেন্ডার নিয়ে ফিফা ও উয়েফার মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ। ইনফ্যান্টিনো, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ এবং প্রতি দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ আয়োজনের মতো বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, যা উয়েফা এবং ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। ইউরোপীয় ফুটবল কর্তৃপক্ষ মনে করে, এই ধরনের প্রস্তাবগুলো খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্টগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেবে, যা ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

এছাড়াও, ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর ভূমিকা নিয়েও উয়েফার অসন্তোষ থাকতে পারে। ইনফ্যান্টিনোর নেতৃত্বে ফিফার বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি এবং নতুন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিয়ে মাঝে মাঝেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। উয়েফা, যা বিশ্ব ফুটবলের একটি প্রধান আর্থিক এবং ক্রীড়াশক্তি, ফিফার কার্যক্রম এবং রাজস্ব বন্টন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে। ব্লাটার-পরবর্তী যুগে যে আমূল সংস্কারের আশা ছিল, তা সম্পূর্ণ না হওয়ায় উয়েফার মধ্যে হতাশা জন্মেছে।

উয়েফার এই কঠোর অবস্থান জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনোর বর্তমান নেতৃত্ব এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত তার কার্যকালকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। যদিও ২০২৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনরায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, ইউরোপীয় ফুটবলের এই প্রভাবশালী সংস্থার অনাস্থা আগামীতে তার জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এটি ফিফা এবং এর সবচেয়ে শক্তিশালী কনফেডারেশনের মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত, যা বিশ্ব ফুটবলের কাঠামো এবং ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্বে নতুন মেরুকরণ এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

Leave a Reply