কুড়ির দশকেই জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি ভেসেক্টমি বেছে নিচ্ছেন তরুণরা: কেন অনুতপ্ত নন তাঁরা?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে এক নতুন সামাজিক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বা ভেসেক্টমি (Vasectomy) করানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথাগত ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেক তরুণ স্বেচ্ছায় এই অস্ত্রোপচার করাচ্ছেন। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ এমন দুই তরুণের মুখোমুখি হয়েছে, যারা নিজেদের তারুণ্যের কালেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এই নিয়ে তাদের মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে স্থান করে নিচ্ছে। সন্তান গ্রহণের চাপ বা সামাজিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে তারা নিজেদের জীবনকে কীভাবে সাজাতে চান, সে বিষয়ে তারা অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। ভেসেক্টমি হলো পুরুষদের একটি ছোট অস্ত্রোপচার, যার মাধ্যমে শুক্রাণু বহনকারী নালীগুলো কেটে বা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর গর্ভধারণের সম্ভাবনা না থাকে। এটিকে একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং প্রায় শতভাগ নিশ্চিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সমাজে সাধারণত বয়স্ক বা ইতিমধ্যেই একাধিক সন্তানের জনক পুরুষদের এই পদ্ধতি বেছে নিতে দেখা যায়। সেদিক থেকে খুব কম বয়সে সন্তানহীন অবস্থায় যুবকদের এই পদক্ষেপ নেওয়া সামাজিক ও চিকিৎসা উভয় মহলেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যে যুবকরা এই পথ বেছে নিয়েছেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে মূলত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত চিন্তা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো কাজ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি সন্তান লালন-পালন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার সংকট নিয়ে সচেতন তরুণরা পৃথিবীতে নতুন জীবন এনে বড় করার ঝুঁকি নিতে চান না। অনেকের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য, কেরিয়ার এবং মানসিক প্রশান্তি সন্তানহীন জীবনের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা মনে করেন, পিতৃত্ব কোনো বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সচেতন পছন্দ হওয়া উচিত।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতের পরিবার কাঠামোর ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। অতীতে জন্মনিয়ন্ত্রণের পুরো দায়িত্ব মূলত নারীদের ওপর বর্তাতো, যার ফলে গর্ভনিরোধক বড়ি বা বিভিন্ন জটিল চিকিৎসাগত পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো নারীদের। বর্তমানে পুরুষরা ভেসেক্টমির মতো স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সেই দায়ভারের অংশীদার হচ্ছেন, যা জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। যদিও ভেসেক্টমিকে সাধারণত স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় হিসেবেই দেখা হয়, তবুও এই তরুণরা সমাজের প্রথাগত প্রত্যাশাকে পেছনে ফেলে নিজেদের মানসিক শান্তি ও জীবনদর্শনকে সর্বাগ্রে স্থান দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রজনন স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত আরও বেশি তরুণদের উদ্বুদ্ধ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
