দলবদলের বাজারে বিলিয়ন পাউন্ডের ঝড়: যেভাবে প্রস্তুতি নেয় প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো

দলবদলের বাজারে বিলিয়ন পাউন্ডের ঝড়: যেভাবে প্রস্তুতি নেয় প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো

ইউরোপীয় ফুটবলে দলবদলের বাজারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের (ইপিএল) ক্লাবগুলোর আধিপত্য ও বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে চলতি মৌসুমের দলবদল শুরু হতেই যেভাবে ক্লাবগুলো অর্থের থলি খুলে বসেছে, তা ফুটবল বিশ্বকে আবারও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলমান ট্রান্সফার উইন্ডোতে ইতিমধ্যেই প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর সম্মিলিত খরচের অঙ্ক ১০০ কোটি পাউন্ড বা এক বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে। তবে ফুটবল সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, এটি কেবল শুরু মাত্র; উইন্ডোর সময়সীমা শেষ হওয়ার দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ক্লাবগুলোর ব্যস্ততা এবং খরচের বহর আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

একটি ফুটবল ক্লাবের জন্য দলবদলের এই সময়টি কতটা জটিল, রুদ্ধশ্বাস এবং নাটকীয় হতে পারে, তা সাধারণ দর্শকদের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। ফুটবল বোদ্ধা ও ক্লাব কর্মকর্তাদের মতে, ‘দলবদলের বাজারে কোনো কিছুই অদ্ভুত বা অসম্ভব নয়।’ শেষ মুহূর্তে চুক্তি বাতিল হওয়া, আকস্মিক মেডিকেল পরীক্ষায় ব্যর্থতা কিংবা এজেন্টের শেষ মুহূর্তের বাড়তি দাবির কারণে ভেস্তে যেতে পারে কয়েক মাস ধরে চলা কোনো আলোচনা। এই অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেই প্রতিটি ক্লাব বছরের পর বছর ধরে তাদের পরিকল্পনা ও রণকৌশল সাজায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খেলোয়াড় এক ক্লাবের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠলেও মাঝপথেই অন্য ক্লাবের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনাও অতীতে দেখা গেছে।

আধুনিক ফুটবলে একটি সফল দলবদলের পেছনে কেবল দলের প্রধান কোচের পছন্দই শেষ কথা নয়। এর পেছনে কাজ করে বিশাল একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক। স্কাউটদের পাঠানো দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট, আধুনিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ বা ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং সর্বোপরি ক্লাবের আর্থিক সক্ষমতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তবেই কোনো ফুটবলারকে দলে ভেড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাধারণত প্রতিটি নির্দিষ্ট পজিশনের জন্য ক্লাবগুলো ‘প্ল্যান-এ’, ‘প্ল্যান-বি’ এবং ‘প্ল্যান-সি’ প্রস্তুত রাখে, যাতে মূল লক্ষ্য পূরণ না হলে দ্রুত বিকল্প খেলোয়াড়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। ফলে পর্দার আড়ালে ক্লাবগুলোর স্পোর্টিং ডিরেক্টর বা ট্রান্সফার কমিটির সদস্যরা ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত সময় পার করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর খরচের ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে উয়েফা এবং প্রিমিয়ার লিগের নিজস্ব ‘প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রুলস’ (পিএসআর) বা আর্থিক সংগতি নীতি। এই নিয়মের কঠোর প্রয়োগের কারণে ক্লাবগুলোকে এখন কেবল নতুন খেলোয়াড় কেনার দিকেই মনোযোগ দিলে চলছে না, পাশাপাশি নিজেদের বর্তমান খেলোয়াড়দের বিক্রি করে আয়ের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে। ভারসাম্য নষ্ট হলে বড় ধরনের পয়েন্ট কাটার শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে ক্লাবগুলোকে। ফলে এবারের ট্রান্সফার উইন্ডোতে খেলোয়াড় অদলবদল এবং বিক্রির ক্ষেত্রেও ক্লাবগুলোকে অনেক বেশি সতর্ক ও সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে।

দলবদলের শেষ দিনগুলোতে, বিশেষ করে ‘ডেডলাইন ডে’-তে নাটকীয়তা চরমে পৌঁছায়। এজেন্টদের অবিরাম ফোন কল, ক্লাব কর্মকর্তাদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত শর্তাদি নির্ধারণের কাজগুলো তখন ঝড়ের গতিতে সম্পন্ন করতে হয়। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর এই বিপুল ব্যয়ের প্রতিযোগিতা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব ফুটবলে তাদের অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি কতটা সুদৃঢ়। তবে মাঠের বাইরে এই বিশাল খরচের লড়াইয়ে জয়ী হলেও, মাঠের পারফরম্যান্সে তার কতটা প্রতিফলন ঘটবে, সেটিই এখন কোটি ফুটবল অনুরাগীর বড় জিজ্ঞাসা।

Leave a Reply