ফুটবলের লাল-হলুদ কার্ডের নেপথ্যের নায়ক আন্তোনিও রাতিন আর নেই

ফুটবলের লাল-হলুদ কার্ডের নেপথ্যের নায়ক আন্তোনিও রাতিন আর নেই

ফুটবল বিশ্বের এক কিংবদন্তি এবং আর্জেন্টাইন ফুটবলের অন্যতম আইকন আন্তোনিও রাতিন ৮৯ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে। লিওনেল মেসি ও আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারদের মতো বর্তমান প্রজন্মের আর্জেন্টাইন তারকারা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে হাতে কালো বন্ধনী পরে মাঠে নেমেছিলেন। দীর্ঘ ১৫ বছর বোকা জুনিয়র্সের হয়ে খেলার পাশাপাশি ১০ বছর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠ কাঁপানো রাতিন কেবল একজন প্রতিভাবান মিডফিল্ডারই ছিলেন না, বরং ফুটবল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের কারিগরও ছিলেন।

রাতিনের নাম ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে মূলত ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে। ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে তাঁকে মাঠ থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দেন। তৎকালীন সময়ে ফুটবলে কার্ডের প্রচলন না থাকায় রেফারি মৌখিকভাবে খেলোয়াড়দের বহিষ্কার করতেন। ভাষা না জানার কারণে রেফারি রাতিনের প্রতিবাদকে গালি হিসেবে ভুল বুঝেছিলেন। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাতিন যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে আছে। এমনকি মাঠ ছাড়ার সময় তিনি ইংল্যান্ডের রানির ব্যবহৃত লাল গালিচায় বসে পড়ার মতো নাটকীয় ঘটনাও ঘটিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এই ঘটনার পরেই ফিফা ফুটবলে ভাষার প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। রেফারি কমিটির তৎকালীন প্রধান কেনেথ জর্জ অ্যাস্টন ট্রাফিক লাইটের রঙের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। অর্থাৎ, ফুটবল খেলায় নিয়ম-শৃঙ্খলার যে আধুনিক রূপ আমরা আজ দেখি, তার মূলে রয়েছে রাতিনের সেই ঐতিহাসিক প্রতিবাদ।

আন্তোনিও রাতিনের সেই বিদায় এবং ইংল্যান্ডের সাথে মাঠের সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির রেশ পরবর্তী কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তীব্র করে তুলেছিল। ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল—এই প্রতিটি মুহূর্তেই রাতিনের সেই ঘটনার ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। আজ ফুটবল বিশ্ব যখন তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে, তখন একই সাথে মনে পড়ছে ফুটবল ইতিহাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। রাতিন কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবলের নিয়মের বিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী। তাঁর মৃত্যুতে ফুটবল এক বর্ণিল চরিত্রের বিদায় দেখল, যা দীর্ঘকাল সমর্থকদের হৃদয়ে অমলিন থাকবে।