বিমসটেক বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ: আঞ্চলিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

বিমসটেক বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ: আঞ্চলিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) এর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠকটি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামাজিক উন্নয়নে নতুন গতিশীলতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই বৈঠকে প্রতিনিধিদল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করবে।

১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিমসটেক, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশকে একত্রিত করেছে – বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ড। এর মূল লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এই জোটের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন খাতে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি বিমসটেকের কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নয়াদিল্লির এই বৈঠকে মূলত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক খাতে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। এছাড়া, আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়ে নতুন প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে, আন্তঃদেশীয় সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগ এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো এজেন্ডায় থাকতে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে আসছে, যা দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে আরও কার্যকর করার এবং শুল্ক বাধা কমানোর বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরবেন। এছাড়া, সন্ত্রাসবাদ দমন, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং মাদক চোরাচালান মোকাবিলায় যৌথ কৌশল প্রণয়নের উপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করাও বিমসটেকের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য তার অবস্থান স্পষ্ট করবে।

বিমসটেক আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জোটের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ও বোঝাপড়া বাড়িয়ে আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিমসটেককে আরও শক্তিশালী করতে এবং এর লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই ধরনের নিয়মিত বৈঠকগুলো আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর পথ প্রশস্ত করে।