মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে জমিসংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আজ রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার আধারা ইউনিয়নের মিজিকান্দি গ্রামে দফায় দফায় এই সহিংসতা চলে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, পরবর্তীতে আহতরা চিকিৎসা নিতে স্থানীয় হাসপাতালে এলে সেখানেও দুই পক্ষের সমর্থকেরা পুনরায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, আধারা ইউনিয়নের মিজিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা বোরহানউদ্দিন ও তাঁর প্রতিবেশী সরাফত আলী সরকারের মধ্যে একটি পৈতৃক ও রেকর্ডভুক্ত জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস-বৈঠক হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। আজ রোববার সকালে বোরহানউদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওই বিরোধপূর্ণ জমিতে নতুন ঘর নির্মাণ করতে যান। এতে সরাফত আলীর লোকজন বাধা দিলে প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা লাঠিসোঁটা, দেশীয় অস্ত্র ও ইটপাটকেল নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত জখম হন।
স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সহিংসতার এখানেই শেষ হয়নি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দুই পক্ষের লোকজন চিকিৎসা নিতে হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হলে সেখানে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি বিভাগের সামনেই বোরহানউদ্দিনের লোকজনের ওপর সরাফতের সমর্থকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আকস্মিক হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় প্রকাশ্য দিবালোকে এমন মারামারির ঘটনায় সাধারণ রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে মুন্সিগঞ্জ সদর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রুহুল আমীন জানান, দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা একটার মধ্যে ৫ থেকে ৭ জন রক্তাক্ত ও আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। তাঁদের প্রায় সবার মাথায় ও শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গুরুতর জখমের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুজনকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সন্ধ্যার দিকে আরও একজনের অবস্থার অবনতি হলে তাঁকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।
এদিকে, এই হামলার ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বোরহানউদ্দিনের ছেলে শরীফ মিজি অভিযোগ করে বলেন, “সরাফত আলী ও তাঁর লোকজন দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বৈধ বসতভিটা দখলের চেষ্টা করছে। তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল। আজ সকালে আমরা আমাদের নিজস্ব জায়গায় ঘর তুলতে গেলে সরাফত সরকার পাশের গ্রাম থেকে আলমগীর ও দুলালসহ একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং আমাদের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আমার ভাই জাহাঙ্গীর মিজিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। আমরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেও তারা সেখানে আমাদের ওপর পুনরায় হামলা চালায়। এমনকি পুলিশ উল্টো আমার ছোট ভাই রাজীব মিজিকে আটক করেছে।”
অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে সরাফত আলী সরকার দাবি করেন, “আমরা কারও ওপর হামলা করিনি, বরং বোরহানউদ্দিনের লোকেরাই আমাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। ওই জমিটি আমাদের রেকর্ডভুক্ত সম্পত্তি। সকালে তারা জোরপূর্বক জমির গাছপালা কেটে তা দখল করার চেষ্টা করছিল। আমরা কেবল আমাদের জমিতে অনধিকার প্রবেশে বাধা দিয়েছি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বোরহান মিজির ছেলেরা লাঠিসোঁটা ও রামদাসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর চড়াও হয়।”
সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তছলিম উদ্দিন জানান, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং নতুন করে কোনো সংঘর্ষের আশঙ্কা রুখতে মিজিকান্দি গ্রাম ও হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকটি অবিস্ফোরিত ককটেল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের কাছ থেকেই লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
