জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের প্রভাবে ইউরোপে ছড়াচ্ছে আগ্রাসী প্রেয়িং ম্যানটিস: স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি

জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের প্রভাবে ইউরোপে ছড়াচ্ছে আগ্রাসী প্রেয়িং ম্যানটিস: স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি

জলবায়ু পরিবর্তন এবং দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে পৃথিবীর প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে এক গভীর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এশিয়া থেকে ইউরোপের দিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশালাকৃতির এক শিকারি পতঙ্গ, যা প্রেয়িং ম্যানটিস নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম এই আগ্রাসী পতঙ্গগুলো ইউরোপের স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতালির জি জান্নাতো মিউজিয়াম অব আর্কিওলজি অ্যান্ড ন্যাচারাল সায়েন্সেসের একদল বিজ্ঞানীর গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে, যা জার্নাল অব অর্থোপ্টেরা রিসার্চে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা ইতিমধ্যেই এই শিকারি পতঙ্গগুলোকে ইউরোপের স্থানীয় বন্যপ্রাণীর জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শহরগুলোর কৃত্রিম উষ্ণ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে এই দ্রুত প্রজননশীল পতঙ্গগুলো ক্রমাগত উত্তরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই আগ্রাসী প্রজাতিটি মধু উৎপাদনকারী মৌমাছির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী কীট, ব্যাঙ ও টিকটিকির মতো ছোট প্রাণী এবং এমনকি ইউরোপের স্থানীয় ম্যানটিস প্রজাতিকেও খেয়ে ফেলছে, যা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং শহুরে উষ্ণ পরিবেশের কারণে এই পতঙ্গগুলো এখন ইউরোপের এমন সব অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা একসময় তাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত ঠান্ডা ছিল। এটি স্থানীয় প্রজাতির জন্য অপ্রত্যাশিত এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পতঙ্গগুলো তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থলের বাইরেও টিকে থাকতে পারছে এবং নতুন নতুন অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করছে। মানুষ এখন পার্ক এবং বাগানসহ বিভিন্ন শহুরে পরিবেশে নিয়মিতভাবে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করছে। যেহেতু এই পতঙ্গগুলো আকারে বেশ বড়, রঙিন এবং দেখতে আকর্ষণীয়, তাই অনেক মানুষই এদেরকে পরিবেশের জন্য হুমকি মনে না করে বাগানের একটি চমৎকার বা আকর্ষণীয় পোকা হিসেবে দেখছেন। এই ভুল ধারণা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বাধা দিচ্ছে।

গবেষক রবার্তো বাতিস্তোন জোর দিয়ে বলেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পতঙ্গগুলো ক্রমশ উত্তরের দিকে তাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। তিনি এবং তার দল এই গবেষণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে এবং এই আক্রমণাত্মক পতঙ্গ দমনের কার্যকর কৌশল তৈরি করতে চেয়েছেন। তাদের তথ্যমতে, এই শিকারি পতঙ্গগুলো যেকোনো পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। একটি স্ত্রী ম্যানটিস একসঙ্গে প্রায় ২০০টি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে, যা ইউরোপের স্থানীয় ম্যানটিস প্রজাতির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে তারা স্থানীয় বন্যপ্রাণীদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে, কারণ তারা দ্রুত খাদ্য শৃঙ্খলের শীর্ষে চলে আসছে এবং অন্যান্য প্রজাতির খাবার ছিনিয়ে নিচ্ছে।

এই আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার শুধু স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যই হুমকি নয়, এটি কৃষি ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মৌমাছির মতো পরাগায়নকারীদের সংখ্যা কমে গেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তার উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। তাই, এই নতুন হুমকির মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকার, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই আক্রমণাত্মক পতঙ্গের বিস্তার রোধ করা কঠিন হবে। এই গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুতন্ত্রে যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পরিবর্তন আসছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া