ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির বয়স এখন ৩৯। আধুনিক ফুটবলের দ্রুতগতির খেলার ধারায় সাধারণত একজন খেলোয়াড় যখন ত্রিশের কোঠার শেষ প্রান্তে পৌঁছান, তখন তার শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ইংল্যান্ডের ফুটবল ঐতিহ্য এবং কৌশল মূলত শারীরিক শক্তি ও উচ্চগতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে হতে পারে, এমন একটি দলের বিপক্ষে একজন ৩৯ বছর বয়সী ফুটবলার, যিনি মাঠের বেশিরভাগ সময় হাঁটাচলা করে কাটান, তিনি খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক এক হাইভোল্টেজ ম্যাচে লিওনেল মেসি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক গতির চেয়েও মস্তিষ্কপ্রসূত ফুটবল অনেক বেশি বিধ্বংসী হতে পারে।
বিবিসি স্পোর্টসের ফুটবল ট্যাকটিক্স বিশেষজ্ঞ উমির ইরফানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেসি কেবল গোল করা বা সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি মাঠের ভেতর থেকে দলের অন-ফিল্ড কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইংল্যান্ডের শক্তিশালী ডিফেন্সিভ লাইন এবং হাই-প্রেসিং ট্যাকটিকস মোকাবিলা করতে গিয়ে মেসি গতির পরিবর্তে নিজের অসামান্য পজিশনাল সচেতনতা ও ভিশনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যখনই ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা তাকে ঘিরে ধরার চেষ্টা করেছেন, মেসি তখন নিখুঁতভাবে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়েছেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বল বিতরণ করেছেন।
মেসির খেলার এই বিবর্তন আধুনিক ফুটবলের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন খেলোয়াড় যখন বলের সাথে দৌড়ে গতি বাড়াতে পারেন না, তখন তিনি যেভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের দুর্বলতা খুঁজে বের করেন, তা বিস্ময়কর। ইংল্যান্ডের কোচিং স্টাফ যখন মাঠের বাইরে থেকে খেলোয়াড়দের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন, মেসি তখন মাঠের ভেতর থেকেই নিজের সতীর্থদের পজিশন পরিবর্তন এবং বল পজিশনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। ইংল্যান্ডের হাই-ইন্টেন্সিটি ফুটবল সিস্টেম মেসিকে আটকাতে গিয়ে বারবার নিজেদের ভারসাম্য হারিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, মেসি পুরো ম্যাচে খুব কম দৌড়ালেও, বল রিসিভ করার মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত কার্যকর। বিপক্ষ দলের রক্ষণের মধ্যবর্তী ‘ডেড জোন’-এ অবস্থান নিয়ে তিনি যেভাবে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন, তা ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের জন্য ছিল এক বড় দুঃস্বপ্ন। অভিজ্ঞতার কাছে গতির হার মানার এই চিত্রটি প্রমাণ করে, ফুটবলে কেবল পায়ের কাজ নয়, বরং চিন্তাশক্তিই জয়ের প্রধান চাবিকাঠি। মেসি আরও একবার দেখালেন কেন তাকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ বলা হয়। তার এই ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস তরুণ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে যে, ফুটবলে দৌড়ানোর চেয়েও কোথায় দাঁড়াতে হবে এবং কখন বল পাস করতে হবে, সেটিই আসল দক্ষতা।
