ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন: পুরনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ও সাংবাদিক আটকের ঘটনায় উদ্বেগ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে মস্কোর সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পশ্চিমা দেশগুলো। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষকদের মতে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি মেটাতে ক্রেমলিন বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের পুরনো ট্যাংক ও সামরিক সরঞ্জাম যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রুশ বাহিনী কেবল পুরনো অস্ত্রই ব্যবহার করছে না, বরং উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তির দিক থেকে তারা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে, যাকে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ‘বিপরীতমুখী যাত্রা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে ভ্লাদিমির পুতিন নিজে খেরসন অঞ্চলে রুশ সামরিক সদর দপ্তরে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন, যা যুদ্ধক্ষেত্রে মস্কোর ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দেয়।
একই সময়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদক ইভান গার্শকোভিচকে দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে আটকে রাখা এবং তার জামিন আবেদন খারিজ হওয়া বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মস্কোর একটি আদালতে ইভান গার্শকোভিচের উপস্থিতির মুহূর্তটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে তাকে কঠোর নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে দেখা গেছে। রুশ আদালত তার আপিল আবেদন প্রত্যাখ্যান করায় এটি স্পষ্ট যে, দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বর্তমানে যে ধরনের পুরনো ট্যাংক ব্যবহার করছে, তা আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতে অত্যন্ত দুর্বল। টি-৫৪ ও টি-৫৫ সিরিজের মতো পুরনো মডেলের এই ট্যাংকগুলো বর্তমানে লজিস্টিক বা গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় ব্যবহৃত হলেও, এটি মস্কোর দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার উচ্চপ্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব সরাসরি দেখা যাচ্ছে তাদের সামরিক উৎপাদনের ওপর।
এই পরিস্থিতির প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ক্রেমলিন একদিকে সামরিক দিক থেকে পুরনো সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ইভান গার্শকোভিচের মতো পেশাদার সাংবাদিকদের বন্দী রাখা রাশিয়ার সেই কঠোর অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও কৌশলগত এই সংকট রাশিয়ার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় পড়বে বলে ধারণা করছেন সমরবিশারদরা।
