এন্ডোমেট্রিওসিস: যে নীরব শারীরিক যন্ত্রণায় কর্মজীবন হারাচ্ছেন হাজারো নারী

এন্ডোমেট্রিওসিস: যে নীরব শারীরিক যন্ত্রণায় কর্মজীবন হারাচ্ছেন হাজারো নারী

বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়লেও একটি নীরব ও তীব্র স্বাস্থ্যগত সমস্যা অনেক নারীর পেশাদার জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অতি সম্প্রতি এক বিশেষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে উঠে এসেছে ‘এন্ডোমেট্রিওসিস’ নামক একটি জটিল রোগে আক্রান্ত নারীদের কর্মজীবনের চরম সংকটের গল্প। তিনজন নারী তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে জানিয়েছেন, কীভাবে এই দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক অসুস্থতা ও তীব্র যন্ত্রণার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের তিলে তিলে গড়া ক্যারিয়ার বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

এন্ডোমেট্রিওসিস হলো এমন একটি রোগ যেখানে জরায়ুর ভেতরের টিস্যুর মতো এক ধরনের কোষ জরায়ুর বাইরে যেমন ডিম্বাশয় বা পেলভিসের অন্যান্য অংশে বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সের প্রায় ১০ শতাংশ নারী এই সমস্যায় ভুগছেন। এই রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋতুস্রাব বা মাসিকের সময় তীব্র তলপেট ও পিঠে ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ক্রনিক ক্লান্তি এবং বন্ধ্যাত্ব। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়া এবং উপযুক্ত চিকিৎসার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে।

তদন্তে অংশ নেওয়া নারীরা জানান, কর্মক্ষেত্রে এই রোগটি নিয়ে চরম অজ্ঞতা এবং সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে। তীব্র ব্যথার কারণে মাসে দুই-একদিন ছুটি নিতে গেলে বা কাজের গতি কিছুটা শ্লথ হলে তাকে অবহেলা বা ফাঁকিবাজি হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মী ও নিয়োগকর্তারা এই জটিল চিকিৎসাগত অবস্থাকে কেবলই সাধারণ ‘মাসিক বা পিরিয়ডের ব্যথা’ বলে সাধারণীকরণ করেন। রোগটি শনাক্ত হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাওয়ার কারণে ভুক্তভোগী নারীরা তাদের অসুস্থতার সপক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো দাপ্তরিক প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেন না, যা তাদের চাকরিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করতেই গড়ে সাত থেকে আট বছর সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে রোগটি শরীরে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ধাপে ধাপে কমিয়ে দেয়। আমাদের সমাজের একটি বড় অংশে পিরিয়ড বা প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনাকে এখনো ‘ট্যাবু’ বা লজ্জাজনক মনে করা হয়। ফলে কর্মজীবী নারীরা তাদের শারীরিক কষ্টের কথা খোলামেলাভাবে সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে শেয়ার করতে পারেন না। এই সামাজিক নীরবতা এবং কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতির অভাব ভুক্তভোগীদের মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে তোলে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে ইস্তফা দেওয়া।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো কর্মক্ষেত্রের কঠোর ও অপরিবর্তনশীল সময়সূচী। এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত নারীদের জন্য নিয়মিত ৯টা-৫টার শারীরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা অনেক সময়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। নমনীয় কর্মঘণ্টা (flexible working hours) বা দূরশিক্ষণ/অনলাইন কাজের (work from home) সুযোগ না থাকায়, অনেক উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ নারী পেশাদার কাজের ক্ষেত্র থেকে অকালেই ছিটকে পড়ছেন। এটি কেবল নারীদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং করপোরেট সেক্টরে জেন্ডার বৈষম্য বা লিঙ্গ সমতা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

চিকিৎসক এবং নারী অধিকার কর্মীদের মতে, এই বৈশ্বিক সংকট দূর করতে হলে কর্মক্ষেত্রের নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী স্বাস্থ্য এবং এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এছাড়া, অসুস্থতার দিনগুলোতে অতিরিক্ত ছুটি বা বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ প্রদানের মতো সংবেদনশীল নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। কেবল উপযুক্ত নীতিমালার মাধ্যমেই বহু নারীর সম্ভাবনাময় কর্মজীবন রক্ষা করা সম্ভব।

Leave a Reply