টেমস ওয়াটারের জাতীয়করণ ঠেকাতে পাওনাদারদের ‘গোল্ডেন শেয়ার’ প্রস্তাব: যুক্তরাজ্যে পানি সংকট নিরসনে নতুন কৌশল
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টেমস ওয়াটারের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা জাতীয়করণ এড়াতে নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন এর ঋণদাতারা। কোম্পানিটিকে রাষ্ট্রীয়করণের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং বেসরকারি খাতের অধীনে এর কার্যক্রম সচল রাখতে পাওনাদাররা সরকারকে একটি ‘গোল্ডেন শেয়ার’ বা বিশেষ সুবিধাযুক্ত অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারের উদ্বেগ দূর করা এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়করণের হাত থেকে বাঁচানো।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেমস ওয়াটারের বিপুল ঋণ এবং চরম আর্থিক সংকটের কারণে যুক্তরাজ্য সরকার (বিশেষ করে বার্নহাম প্রশাসন বা ব্রিটিশ নীতিপ্রণেতারা) কোম্পানিটিকে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে রাষ্ট্রীয়করণের চিন্তাভাবনা করছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পাওনাদারদের বিনিয়োগ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতি এড়াতেই ঋণদাতারা এমন একটি প্রস্তাব তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে কোম্পানিটির ওপর সরকারের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু এটি সরাসরি সরকারি মালিকানায় যাবে না।
‘গোল্ডেন শেয়ার’ হলো এমন একটি বিশেষ শেয়ার যা কোনো শেয়ারহোল্ডারকে (এক্ষেত্রে সরকারকে) কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ বা ব্লক করার ক্ষমতা দেয়, যদিও তাদের আর্থিক মালিকানার অংশ অত্যন্ত সীমিত থাকে। এই কাঠামোর আওতায় সরকার কোম্পানির কৌশলগত সিদ্ধান্ত, সম্পদের বিক্রি এবং নতুন ঋণ গ্রহণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা পাবে। ঋণদাতাদের বিশ্বাস, এই ব্যবস্থার ফলে সরকারের নীতিগত উদ্বেগ যেমন হ্রাস পাবে, তেমনই কোম্পানিটির আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে টেমস ওয়াটার প্রায় ১৫ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ঋণের বোঝায় জর্জরিত। গত কয়েক বছর ধরে অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো উন্নয়ন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং পরিবেশগত নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফওয়াট (Ofwat)-এর কঠোর অবস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের নতুন মূলধন জোগাতে অস্বীকৃতির পর থেকেই কোম্পানিটির দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। যদি সরকার এটিকে সরাসরি অধিগ্রহণ করে, তবে করদাতাদের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে, যা এড়ানোই এখন সব পক্ষের মূল লক্ষ্য।
এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো যুক্তরাজ্যের সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষা। টেমস ওয়াটার লন্ডন এবং টেমস ভ্যালি অঞ্চলের প্রায় দেড় কোটি মানুষকে পানি সরবরাহ করে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির যেকোনো ধরনের পতন বা বিশৃঙ্খলা সরাসরি জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। গ্রাহকদের স্বার্থ এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিটির ওপর কঠোর নজরদারি রাখছে। ঋণদাতারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, গোল্ডেন শেয়ার কাঠামোর মাধ্যমে কোম্পানিটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকলে আরও দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে, যা সরকারি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাওনাদারদের এই প্রস্তাবটি সংকট সমাধানের একটি চমৎকার মধ্যপন্থা হতে পারে। তবে বার্নহাম সরকার বা পানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত সম্মত হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। যদি এই সমঝোতা ব্যর্থ হয়, তবে টেমস ওয়াটারের জাতীয়করণ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে, যা যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হবে। আগামী দিনগুলোতে ঋণদাতা এবং সরকারের মধ্যে এ সংক্রান্ত আলোচনা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
