ব্রাজিলের আমাজনে অগ্নিকাণ্ডের হার ঐতিহাসিক কমার রেকর্ড: চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে

ব্রাজিলের আমাজনে অগ্নিকাণ্ডের হার ঐতিহাসিক কমার রেকর্ড: চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রান্তীয় বৃষ্টিবহুল বন ব্রাজিলের আমাজনে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার আয়তন লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক কৃত্রিম উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে আমাজন বনে দাবানল ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে পুড়ে যাওয়া জমির পরিমাণ চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। পরিবেশ পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা ‘ম্যাপবায়োমাস’ (MapBiomas)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের তথ্য সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এযাবৎকালের মধ্যে ২০২৫ সালেই আমাজনে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে কম রেকর্ড করা হয়েছে।

পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায় এ জাতীয় ইতিবাচক পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাজিলের বর্তমান সরকারের বাস্তবায়িত পরিবেশবান্ধব নীতি, বনাঞ্চলে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা এবং অবৈধ বন উজাড়কারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের কারণে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আমাজনের সংবেদনশীল অঞ্চলে নির্দিষ্ট শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা বৃদ্ধি পাওয়া আগুন ছড়িয়ে পড়ার গতি রোধে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

ম্যাপবায়োমাস হলো ব্রাজিলীয় বিজ্ঞানী, এনজিও ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ গবেষণা উদ্যোগ, যা কৃত্রিম উপগ্রহের ভিজ্যুয়াল ডেটা বিশ্লেষণ করে ভূমির ব্যবহার ও বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে থাকে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকে নিয়মিত নজরদারির পর দেখা গেছে, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে অবৈধ কাঠুরে, গবাদি পশুর খামারি ও সয়াবিন চাষিদের মাধ্যমে বনাঞ্চলে আগুন লাগানোর যে প্রবণতা ছিল, তা আইনি কঠোরতার দরুন সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই কমে এসেছে। পূর্ববর্তী সরকারের মেয়াদে বন উজাড় ও দাবানলের যে ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল, তার বিপরীতে বর্তমান পরিবেশ নীতির প্রয়োগ বাস্তব সুফল আনছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্ব পরিবেশ রক্ষা নীতিতে আমাজন বনের ভূমিকা অপরিসীম। বিশাল এই বনাঞ্চলকে প্রায়শই ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ এটি বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন ধরে আগুনে বন পুড়ে ছাই হওয়ার কারণে আমাজনের কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছিল। নতুন এই পরিসংখ্যানে আমাজন পুনরায় তার স্বাভাবিক কার্বন শোষকের ভূমিকা ধরে রাখার আশা জাগাচ্ছে।

যদিও ম্যাপবায়োমাসের এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, তবুও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে কেবল একটি বছরের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে উদাসীন হওয়া চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের সামগ্রিক অভিঘাতে সৃষ্ট খরা ও অনাবৃষ্টির ঝুঁকি এখনও বহাল রয়েছে। তাই আমাজনের সম্পূর্ণ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুশাসন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন এবং স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত বনাঞ্চল সুরক্ষা প্রযুক্তিকে সার্বক্ষণিকভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ দিচ্ছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা।

Leave a Reply