সৈয়দপুরে শতবর্ষী রেলওয়ে গাছ কাটার নিলাম স্থগিত, জনমনে স্বস্তি
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে বাংলাদেশ রেলওয়ের শতবর্ষী ৩৩টি গাছ কাটার জন্য নির্ধারিত নিলাম কার্যক্রম অপ্রত্যাশিতভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যদিও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি, তবে ‘অনিবার্য কারণ’ দর্শিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এই স্থগিতাদেশ স্থানীয় জনমনে স্বস্তি এনেছে, কারণ গাছগুলো রক্ষা করার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা ও সমালোচনা চলছিল।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সৈয়দপুরের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (ইনচার্জ) মো. তহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ৫ জুলাই প্রকাশিত নিলাম বিজ্ঞপ্তির আওতায় ১২ ও ১৪ জুলাই যে গাছ বিক্রির নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরবর্তীতে নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিলামের তারিখ ও অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে। এই সিদ্ধান্তের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে দপ্তর, সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সৈয়দপুর পৌরসভা, স্টেশনমাস্টার এবং সৈয়দপুর প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এই নিলাম কার্যক্রম স্থগিতের পেছনে স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহল ও জনসাধারণের জোর দাবি একটি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সৈয়দপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী এই গাছগুলো কাটা নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে, বিশেষ করে প্রথম আলো অনলাইনে এবং এর ছাপা সংস্করণে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে গাছ কাটার উদ্যোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও সংরক্ষণের দাবির বিষয়টি উঠে আসে, যা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অনেক স্থানীয় বাসিন্দা গাছগুলো কাটার পরিবর্তে সেগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করে সংরক্ষণের সুযোগ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
সৈয়দপুর রেলওয়ের ইতিহাস ও এসব গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৭০ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে এখানে উপমহাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করে। ব্রিটিশ ইংরেজ কর্মকর্তারা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের আবাসন ও জীবনযাত্রার সুবিধার জন্য সৈয়দপুর শহরটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়। সেই সময়ে শহরজুড়ে সুপরিকল্পিত সড়ক, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সড়কবাতি স্থাপন করা হয়। বিদ্যুতের প্রচলন না থাকলেও, কুপিবাতির মাধ্যমে সড়কগুলো আলোকিত করা হতো। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃক্ষ রোপণ করা হয়, যার মধ্যে অনেক গাছই বর্তমানে শতবর্ষী।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করে আসছিল যে, এই শতবর্ষী গাছগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলো অপসারণ করা জরুরি। বন বিভাগের প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েই ৩৩টি গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে, স্থানীয়দের যুক্তি ছিল, ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলোকে বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে ছাঁটাই বা অন্য কোনো উপায়ে নিরাপদ করা যায় কিনা, তা আগে যাচাই করা উচিত। তাদের মতে, এই গাছগুলো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, বরং শহরের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবেও কাজ করে।
নিলাম স্থগিতের পর এখন সকলের দৃষ্টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। জনদাবি এবং পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে হয়তো গাছগুলো রক্ষার একটি নতুন পথ খুলবে এবং স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও একবার সামনে আসবে। একই সাথে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলোর বিকল্প হিসেবে নতুন করে ৫ হাজার গাছ লাগানোর যে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তবে তা শহরের সবুজায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে।
এই ঘটনাটি শহর উন্নয়নের সাথে পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। আশা করা যায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন সকলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করবে, যা সৈয়দপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
