বিশ্বের পোশাক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে নিজের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এই অর্জন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিযোগিতার ধরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন দীর্ঘকাল ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও, সাপ্লাই চেইন বৈচিত্র্যকরণ এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে এখন ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে চীন এখনো শীর্ষস্থান দখল করে আছে। তবে গত কয়েক বছরে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অনেক মার্কিন ক্রেতা তাদের ক্রয়াদেশ অন্যান্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাশ্রয়ী মূল্য এবং গুণগত মান নিশ্চিত করে মার্কিন ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেছে। তবে ভিয়েতনাম খুব দ্রুত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিযোগী হিসেবে উঠে এসেছে। ভিয়েতনামের শক্তিশালী লজিস্টিক অবকাঠামো এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা তাদের প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা এখন কেবল স্বল্পমূল্যের পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির দিকে নজর দিচ্ছেন। পরিবেশবান্ধব কারখানা বা ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ স্থাপনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করায় মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কিন্তু এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বাংলাদেশের শিল্প মালিকদের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং গ্লোবাল কমপ্লায়েন্স বজায় রাখা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধার পরিবর্তন কীভাবে রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না, বরং পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে কৃত্রিম তন্তুর (ম্যান-মেড ফাইবার) ব্যবহার বিশ্ববাজারে বাড়ছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো দুর্বল। এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য বড় বাজারেও রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব। সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা যেমন গৌরবের, তেমনি এই অবস্থান আরও সুসংহত করতে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও কৌশলগত পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও উদ্যোক্তারা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা আগামী দিনেও অটুট থাকবে বলে আশা করা যায়।
