আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি: কেন গুরুত্বপূর্ণ চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মূলত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে এবং পূর্বে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডরের একটি বিকল্প বা উপ-অংশ হিসেবে এই ত্রিপক্ষীয় সংযোগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এই করিডর কেবল তিনটি দেশের ভৌগোলিক দূরত্বই কমাবে না, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূকৌশলগত সমীকরণে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডরের মাধ্যমে চীনের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশটির স্থলবেষ্টিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা। বর্তমানে চীনের সিংহভাগ বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেলে চীন অত্যন্ত দ্রুত ও কম খরচে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে জ্বালানি আমদানি এবং ইউরোপে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। এ কারণে বেইজিংয়ের কাছে এই করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশের জন্য এই করিডর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক বিশাল দুয়ার খুলে দিতে পারে। প্রথমত, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগের একটি প্রধান কেন্দ্রে বা ‘হাব’-এ পরিণত হবে। চীনের বিশাল বিনিয়োগের সহায়তায় দেশের সড়ক ও রেল অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নয়ন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি চীন ও মিয়ানমারের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে, যা রপ্তানি আয় বাড়াতে সাহায্য করবে। এছাড়া, চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা এবং উপযোগিতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে এই করিডর বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধ। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অবনতিশীল। বাংলাদেশ ও চীন সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাজ্যগুলোতে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বৃদ্ধি পাওয়ায় যেকোনো অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন ইস্যুটি ঝুলে থাকায় ঢাকা ও নেপিডোর মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন বজায় রয়েছে, যা এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের গতিকে ধীর করে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে, এই অঞ্চলে ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকায় বাংলাদেশের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা জরুরি। ভারত চীনের এই বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে নিজের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক মনে করে। ফলে, বাংলাদেশ যাতে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখলেও, এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যকার কূটনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর।
