শীর্ষ আম উৎপাদক হয়েও কেন আম আমদানি করে বাংলাদেশ? নেপথ্যের কারণ ও সমাধান

শীর্ষ আম উৎপাদক হয়েও কেন আম আমদানি করে বাংলাদেশ? নেপথ্যের কারণ ও সমাধান

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আম আমদানি করে, যা অনেককেই বিস্মিত করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদিত হয় এবং এদেশের আম তার স্বাদ ও গন্ধের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এমন পরিস্থিতিতে কেন বাংলাদেশকে বিদেশের উপর নির্ভর করতে হয়, তা একটি জটিল অর্থনৈতিক ও কৃষিভিত্তিক প্রশ্ন। এই আমদানির পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ, যা কেবল ফলনের অভাব নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ পদ্ধতি, ভোক্তার চাহিদা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, প্রায়শই সপ্তম বা অষ্টম স্থানে অবস্থান করে। প্রতি বছর দেশে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। দেশের অর্থনীতিতে আমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব ব্যাপক। হাজার হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ী আম চাষ এবং বিপণনের সঙ্গে জড়িত। দেশীয় আমের মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, গোপালভোগ, আশ্বিনা, হাঁড়িভাঙা ইত্যাদি জাত অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং এদের নিজস্ব বাজার চাহিদা রয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ উৎপাদন সত্ত্বেও কেন আমদানির প্রয়োজন হয়, তা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ জরুরি।

আম আমদানির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মৌসুমী ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট জাতের চাহিদা। বাংলাদেশে আমের মৌসুম সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। এই সময়ে বাজারে পর্যাপ্ত দেশি আম পাওয়া গেলেও বছরের বাকি সময়, বিশেষ করে শীতকালে বা গ্রীষ্মের শুরুতে যখন দেশি আম সহজলভ্য নয়, তখন বিদেশি আমের চাহিদা তৈরি হয়। এই চাহিদা পূরণে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশ থেকে আম আমদানি করা হয়। এছাড়া, কিছু ভোক্তা বিদেশি, বিশেষ করে ভারতের আলফানসো বা অন্যান্য বিশেষ জাতের আমের প্রতি আকৃষ্ট হন, যা বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হয় না বা ভিন্ন স্বাদের জন্য আমদানি করা হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ফসল তোলার পরবর্তী ক্ষতি এবং দুর্বল অবকাঠামো। বাংলাদেশে উৎপাদিত আমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সঠিক সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। উপযুক্ত হিমাগার, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক আম পাকার পর দ্রুত পচে যায় বা মান খারাপ হয়ে যায়। এর ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং যে পরিমাণ আম উৎপাদিত হয়, তার পুরোটা ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। এই ক্ষতি আমদানির প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তোলে, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত আম আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না।

শিল্প কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আমের চাহিদা সারা বছরই থাকে। জুস, জ্যাম, জেলি বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য তৈরির জন্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট মান ও পরিমাণের আম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। অনেক সময় দেশীয় বাজার থেকে সারা বছর ধরে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না, বিশেষ করে অফ-সিজনে। তখন আমদানিকৃত আম এই শিল্পের কাঁচামালের যোগান দেয়। এছাড়া, আমদানিকৃত আমের মান নিয়ন্ত্রণ, গ্রেডিং এবং প্যাকেজিং অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় আমের চেয়ে উন্নত হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক ক্রেতা বা উচ্চবিত্ত ভোক্তাদের কাছে এর কদর বেশি।

এই আমদানির ফলে একদিকে যেমন দেশীয় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তেমনি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হয়। তবে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। প্রথমত, আধুনিক হিমাগার স্থাপন ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে ফসল তোলার পরবর্তী ক্ষতি কমানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে অফ-সিজনেও দেশীয় আমের ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, উন্নত জাতের গবেষণা ও চাষাবাদের মাধ্যমে আমের মৌসুমের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জাতের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য মানসম্মত আম উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ একদিকে যেমন আম আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারবে, তেমনি বিশ্ববাজারেও নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবে।