হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার: ইরানের ওপর মার্কিন চাপ অব্যাহত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়েছিল, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই বিতর্কিত ঘোষণাটি দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল ও বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারতো। এই আকস্মিক প্রত্যাহার সত্ত্বেও, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ থেকে তেহরানের প্রভাব কমানোর দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টায় অনড় রয়েছে। মূলত, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ পুনরায় আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ওয়াশিংটনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিরই একটি অংশ।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই চলাচল করে। ইরান এই প্রণালীর উত্তর উপকূলে অবস্থিত এবং এর ওপর দেশটির ঐতিহাসিক প্রভাব রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না, বরং এটি ছিল ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি কৌশলগত চেষ্টা। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে গিয়েছিল। ২০১৫ সালে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তি (জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ) থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে বেরিয়ে আসা এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর থেকেই এই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ওয়াশিংটন দাবি করে আসছিল যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ছড়াচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
হরমুজ প্রণালী এবং এর আশপাশের অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ঘটনা এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ট্যাঙ্কার হামলা, ড্রোন ভূপাতিত করা এবং সামরিক মহড়ার মতো ঘটনাগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনাগুলোর জন্য ইরানকে দায়ী করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। এই প্রেক্ষাপটেই হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের মতো কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের চিন্তা করা হয়েছিল, যা ইরানের তেল রপ্তানিকে আরও কঠিন করে তুলত।
মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসার সম্ভাবনা ছিল। এমন একটি পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারতো এবং তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতো। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের শুল্কের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারতো, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারতো। তৃতীয়ত, এটি বাস্তবায়ন করাও একটি জটিল প্রক্রিয়া ছিল, যেখানে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিও থেকে যেতো। সম্ভবত, ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবগুলো বিবেচনা করে কৌশলগতভাবে এটি প্রত্যাহার করে নেয়।
শুল্কের হুমকি প্রত্যাহার করা হলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা, তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং, ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অবরোধের মাধ্যমে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও সীমিত করার চেষ্টা করা হবে, বিশেষ করে তেল রপ্তানি, যা দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ ইরানের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জ করছে।
হরমুজ প্রণালীর মতো একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়ার মতো প্রধান শক্তিগুলো এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছে। তাদের জন্য, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমর্থন হারিয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করা হলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং ক্ষমতার লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রেখে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর।
