সাম্প্রতিক ভয়াবহ অতিবৃষ্টি এবং এর ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় যখন রাজধানী ঢাকার জনজীবন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে গুলশান সোসাইটি। মঙ্গলবার সংগঠনটি ঢাকার কড়াইল বস্তিসহ আশপাশের বিভিন্ন পানিবন্দী ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে। এই উদ্যোগ দুর্যোগকবলিত মানুষের তাৎক্ষণিক খাদ্য সংকট নিরসনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা সমাজের প্রতি তাদের গভীর অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
রাজধানী ঢাকা প্রতি বছরই বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার শিকার হয়, তবে এবারের পরিস্থিতি যেন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল ও জলাশয় দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত—এই সবকিছুই ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের প্রধান সড়কগুলো থেকে শুরু করে অলিগলিতেও হাঁটু বা কোমর সমান পানি জমে যায়, যা জনজীবনকে স্থবির করে তোলে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ এবং বস্তি এলাকার বাসিন্দারা এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের ঘরবাড়ি সহজে তলিয়ে যায় এবং জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণেও চরম সংকট দেখা দেয়।
গুলশান সোসাইটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই কঠিন সময়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তারা তাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছে। এই সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, মঙ্গলবার রাতে কড়াইল বস্তি এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে পানিবন্দী মানুষের কাছে নৌকাযোগে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত, মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধা এবং সংগঠনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। রাতের আঁধারে নৌকায় করে খাবার বিতরণের দৃশ্যটি দুর্যোগের ভয়াবহতা এবং একই সাথে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
এই মানবিক উদ্যোগ প্রসঙ্গে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই সংকটময় মুহূর্তে পানিবন্দী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নাগরিক এবং নৈতিক দায়িত্ব। গুলশান সোসাইটি সব সময়ই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।” তার কথায় সমাজের প্রতি তাদের গভীর অঙ্গীকার এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এমন দুর্যোগে সমাজের বিত্তবান এবং সক্ষম অংশকে এগিয়ে আসা অপরিহার্য।
ওমর সাদাত সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “পানিবন্দী মানুষের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জরুরি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি। আমরা সাধ্যমতো তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করছি। সমাজের অন্যান্য সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও সংগঠনকেও এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।” এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল তাৎক্ষণিক সংকটই তৈরি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করে। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব।
গুলশান সোসাইটির এই উদ্যোগ দুর্যোগের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যখন রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন হয়, তখন বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগও কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একদিকে যেমন তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা অপরিহার্য, তেমনি অন্যদিকে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নও জরুরি। উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল পুনরুদ্ধার—এসব পদক্ষেপই কেবল ভবিষ্যতে রাজধানীবাসীকে এমন দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে এবং একটি টেকসই নগর জীবন নিশ্চিত করতে পারে।
