ব্রিটিশ ব্যাকপ্যাকার পিটার ফ্যালকনিও হত্যাকাণ্ড: ২৫ বছর পর নতুন ছবি প্রকাশ করল অস্ট্রেলীয় পুলিশ

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রহস্যে ঘেরা ব্রিটিশ ব্যাকপ্যাকার পিটার ফ্যালকনিও হত্যাকাণ্ড। অবশেষে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রায় ২৫ বছর পর কিছু পূর্বে অপ্রকাশিত ছবি প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলীয় পুলিশ। প্রশাসনের আশা, এই ছবিগুলো সাধারণ মানুষের স্মৃতিকে নাড়া দেবে এবং এর মাধ্যমে অবশেষে ফ্যালকনিওর মরদেহের সন্ধান মিলবে। ২০০১ সালে সংঘটিত এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডটি তৎকালীন সময়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০১ সালের জুলাই মাসে। ব্রিটিশ পর্যটক পিটার ফ্যালকনিও এবং তার বান্ধবী জোয়ান লিস অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির স্টুয়ার্ট হাইওয়ে ধরে একটি ক্যাম্পারভ্যানে করে যাচ্ছিলেন। সে সময় ব্যারো ক্রিকের কাছে ব্র্যাডলি জন মারডক নামের এক ব্যক্তি তাদের গাড়ি থামানোর সংকেত দেন। গাড়ি থামানোর পর ফ্যালকনিও যখন মারডকের সাথে কথা বলতে গাড়ির পেছনে যান, তখনই একটি গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপর মারডক জোয়ান লিসকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করেন, কিন্তু লিস অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে একটি দূরপাল্লার ট্রাকের চালক তাকে উদ্ধার করেন। তবে পিটার ফ্যালকনিওকে আর কখনো জীবিত বা মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘ তদন্তের পর ২০০৫ সালে ব্র্যাডলি জন মারডককে পিটার ফ্যালকনিও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে মারডক শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন এবং ফ্যালকনিওর মরদেহ কোথায় লুকানো হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফলে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ফ্যালকনিওর মরদেহের কোনো সন্ধান পায়নি পুলিশ। অস্ট্রেলিয়ার বিশাল এবং দুর্গম ‘আউটব্যাক’ বা মরুভূমি অঞ্চলে এই অনুসন্ধান চালানো অত্যন্ত দুরূহ কাজ ছিল। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন অনুসন্ধানকারী দল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তল্লাশি চালালেও কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি।

পিটার ফ্যালকনিওর পরিবার যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা। তারা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, যাতে তাকে যথাযথ মর্যাদায় সমাহিত করা যায়। তাদের এই মানসিক যন্ত্রণা লাঘব করতেই পুলিশ পুনরায় এই মামলাটি নিয়ে সক্রিয় হয়েছে এবং নতুন করে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশের প্রকাশিত নতুন ছবিগুলোতে অপরাধের রাতের কিছু চিত্র, সন্দেহভাজন ব্যক্তির ব্যবহৃত গাড়ি এবং তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু দৃশ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দারা বিশ্বাস করেন, সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনের ভয় কেটে যায় এবং অনেকে হয়তো এখন মুখ খুলতে পারেন, যা ২৫ বছর আগে সম্ভব ছিল না।

এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ফলে এখন পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করা অনেক সহজ হয়েছে। তারা আশা করছেন, এই নতুন ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এমন কোনো পর্যটক বা প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান মিলতে পারে, যিনি হয়তো ঘটনার সময় ওই পথ দিয়ে ভ্রমণ করছিলেন কিন্তু বিষয়টি তখন গুরুত্ব সহকারে নেননি। ফ্যালকনিওর পরিবারের পক্ষ থেকেও বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, যেন কেউ কোনো তথ্য জেনে থাকলে তা পুলিশকে জানান।

নর্দার্ন টেরিটরি পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘আমরা পিটার ফ্যালকনিওর পরিবারকে শান্তি দিতে চাই। তার দেহাবশেষ খুঁজে বের করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আমরা আশা করি, এই নতুন ছবিগুলো দেখে কেউ না কেউ এমন কোনো তথ্য নিয়ে এগিয়ে আসবেন যা আমাদের সঠিক স্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।’ এই মামলাটি অস্ট্রেলিয়ার অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম জটিল এবং আলোচিত একটি ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এই রহস্যের অবসান ঘটবে কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়।