মাঝরাতের পর কিশোর-কিশোরীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: যুক্তরাজ্য সরকারের নতুন পরিকল্পনা
যুক্তরাজ্যে কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি কমাতে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণার মাত্র এক মাস পর এবার ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য মাঝরাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ‘কারফিউ’ জারির পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এই বয়সের কিশোর-কিশোরীরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করতে পারবে না।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তি প্রতিরোধে এবং তাদের সুস্থ জীবনধারা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় শুধু সময়ের ব্যবধানই নির্ধারণ করা হচ্ছে না, বরং ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের অ্যাকাউন্টে ডিফল্ট সেটিং হিসেবে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হবে, যা একটানা স্ক্রলিংয়ের মতো আসক্তিকর ফিচারগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেবে। তবে সমালোচকরা এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, ব্যবহারকারীরা চাইলে এই ডিফল্ট সেটিং পরিবর্তন করতে পারবেন। এছাড়া এই নিয়মগুলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এবং কতটা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, গত মাসেই যুক্তরাজ্য সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্যও আংশিক বিধিনিষেধ বা কারফিউর প্রস্তাব আনা হলো। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই নতুন নিষেধাজ্ঞা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এই নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেন্ডাল এক বিবৃতিতে জানান, ‘এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো তরুণদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, যাতে তারা স্কুল ও কলেজে নিজেদের পড়াশোনায় সঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারে। একই সাথে এটি তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে ভার্চুয়াল জগতের বাইরে গিয়ে আরও বেশি মানসম্মত সময় কাটাতে সহায়তা করবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
নতুন এই নীতিমালার আওতায় কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। ১৮ বছরের কম বয়সী তরুণরা যখন এআই চ্যাটবট ব্যবহার করবে, তখন তাদের নির্দিষ্ট সময় পর পর বাধ্যতামূলক বিরতি (ব্রেক) নিতে হবে। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা। তারা এটিকে তরুণদের সুরক্ষায় একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে বিপরীত সুরও শোনা যাচ্ছে কিছু প্রযুক্তি ও নাগরিক অধিকার সংস্থার কণ্ঠে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা তরুণদের আরও অনিরাপদ ও বিকল্প উপায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা তাদের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের প্রযুক্তি আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের এই সাহসী পদক্ষেপ অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। তবে আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি জায়ান্টদের সহযোগিতা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
