ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণে যুক্তরাজ্যের কঠোর পদক্ষেপ: ক্ষুব্ধ বেইজিংয়ের কড়া প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্যের ইস্পাত শিল্পের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘ব্রিটিশ স্টিল’কে সরকারি মালিকানায় ফিরিয়ে আনার বা জাতীয়করণের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। লন্ডনের এই পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য নীতির পরিপন্থী এবং অন্যায্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকার মনে করছে, দেশের কৌশলগত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এই শিল্পকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন সময়ের দাবি। ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইস্পাত উৎপাদন একটি ‘অপরিহার্য জাতীয় সক্ষমতা’ (vital national capability), যা কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে চীনের জিংয়ে গ্রুপ (Jingye Group) ব্রিটিশ স্টিলকে অধিগ্রহণ করেছিল। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি নানা ধরনের আর্থিক সংকট এবং পরিবেশগত বিধি-নিষেধের মোকাবিলা করে আসছিল। সম্প্রতি বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্রিটিশ সরকার এবং চীনা মালিকপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর যখন কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি, তখনই যুক্তরাজ্য সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় জাতীয়করণের পথ বেছে নেয়।
বেইজিং এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে যে, ব্রিটিশ স্টিলের চীনা মালিকপক্ষ গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং স্থানীয় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ সরকারের এই হস্তক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছে চীন। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই ধরনের জাতীয়করণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করবে এবং যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগবান্ধব ভাবমূর্তি নষ্ট করবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের স্কানথর্প (Scunthorpe) সহ অন্যান্য ইস্পাত কারখানাগুলোর শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফার ওপর নির্ভর না করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা বাড়বে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা খাত এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ইস্পাতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার ফলে যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যকার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেতে পারে। বিশেষ করে যখন বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন শক্তিধর দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, তখন যুক্তরাজ্যের মতো একটি দেশের এমন রক্ষণশীল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শীঘ্রই একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপের মাধ্যমে ব্রিটিশ স্টিলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে, যেখানে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন স্টিল’ উৎপাদনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে।
