টাঙ্গাইলে বাবার জানাজায় মুঠোফোনে বক্তব্য দিলেন পলাতক সাবেক এমপি ছোট মনির

টাঙ্গাইলে বাবার জানাজায় মুঠোফোনে বক্তব্য দিলেন পলাতক সাবেক এমপি ছোট মনির

টাঙ্গাইলে এক নজিরবিহীন ঘটনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর হাসানের (ছোট মনির) বাবা আলহাজ আব্দুল গফুরের দাফন ও জানাজা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা এই সাবেক সংসদ সদস্য তাঁর বাবার শেষ বিদায়ের মুহূর্তে সরাসরি উপস্থিত হতে না পারলেও, প্রযুক্তির সহায়তায় মুঠোফোনে যুক্ত হয়ে জানাজায় বক্তব্য দিয়েছেন। রোববার বিকেলে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জানাজায় তাঁর এই বক্তব্য মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয়, যা উপস্থিত মুসল্লি ও স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ আইনজীবী আব্দুল গফুর গত শনিবার ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর রোববার দিনভর দফায় দফায় জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় রোববার সকালে টাঙ্গাইল আদালত প্রাঙ্গণে, যেখানে তাঁর সহকর্মী আইনজীবীরা অংশ নেন। এরপর দুপুরে তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালপুর উপজেলার বড়মা গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা এবং সবশেষে বিকেলে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তৃতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে তাঁকে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্তানে দাফন করা হয়।

বিকেলে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা মরদেহের পাশে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে মুঠোফোনে যুক্ত হন সাবেক এমপি তানভীর হাসান ছোট মনির। তাঁর সেই বক্তব্যটি মসজিদের ভেতরের মাইকের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। মুঠোফোনে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি তাঁর প্রয়াত বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে সবার কাছে দোয়া চান। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বাবার কাছে যদি কারও কোনো দেনা-পাওনা বা আর্থিক দাবি থাকে, তবে তা যেন পরিবারকে জানানো হয়। বাবার যাবতীয় ঋণ ও পাওনা তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিশোধ করে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির। শুধু তিনিই নন, তাঁর ভাই এবং সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের টাঙ্গাইল শহর শাখার সহসভাপতি গোলাম কিবরিয়া বড় মনিও বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থানকালীন সময়ে টাঙ্গাইলে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, হত্যাচেষ্টা এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ তাঁদের খুঁজলেও এখন পর্যন্ত তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অন্যদিকে, তাঁদের বড় ভাই গোলাম সরোয়ার একজন জার্মানি প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং তিনি কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নন বলে জানা গেছে।

অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জানাজা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের বাইরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। জানাজা শুরুর সময় মসজিদের বাইরে পুলিশ সদস্যরা ডিউটিরত অবস্থায় থাকলেও মসজিদের ভেতরে পলাতক আসামির মুঠোফোনে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জানাজায় উপস্থিত থাকা টাঙ্গাইল শহরের বেবিস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন মুসল্লি জানান, সাবেক এমপির বাবার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। তবে পলাতক অবস্থায় এভাবে মুঠোফোনে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি অনেককেই বিস্মিত করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকা সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের এমন অভিনব উপায়ে জনসমক্ষে আসার ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।