লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা স্যার এড ডেভি ফিফা থেকে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) এবং ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা) কে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং বিশ্ব ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা “সুন্দর ফুটবলের মর্যাদা ধ্বংস করছে”। এই আহ্বান ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং এর পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে, যা বিশ্বব্যাপী ফুটবল ভক্ত ও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্যার এড ডেভি তার বিবৃতিতে বলেন, ফিফা ধারাবাহিকভাবে তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ফুটবলের মূল আদর্শগুলো থেকে সরে এসেছে। তার মতে, বর্তমান ফিফা নেতৃত্ব ফুটবলের সৌন্দর্য ও নৈতিকতা বজায় রাখার পরিবর্তে বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, ফিফার এই কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিশ্বব্যাপী ভক্তদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে, যার ফলে এফএ এবং উয়েফার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর জন্য ফিফার সাথে যুক্ত থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি মনে করেন, ফিফার বর্তমান গতিপথ ফুটবলের মৌলিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ফিফার বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ নতুন নয়। বহু বছর ধরেই সংস্থাটি দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমালোচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে, সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারের আমলে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ফিফার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০১৪ সালের সংস্কার এজেন্ডার অংশ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তবে তার নেতৃত্বকালেও বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনা থেমে নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিতর্কিত বিশ্বকাপের আয়োজন, নির্দিষ্ট কিছু দেশের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং ঘন ঘন টুর্নামেন্টের বিন্যাস পরিবর্তনের প্রস্তাবনাগুলো ফিফার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব বিতর্ক ফিফার প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ফিফা থেকে প্রত্যাহারের এই আহ্বান নিছক ক্রীড়া বিষয়ক একটি মন্তব্য নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নৈতিক শাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী একটি দলের পক্ষ থেকে এমন দাবি আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। তারা মনে করে, ফুটবলের সাথে জড়িত সকল সংস্থাকে অবশ্যই নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে এবং ক্রীড়ার মূল চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হবে। তাদের এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি বৈশ্বিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার সঠিক পরিচালনা অপরিহার্য।
তবে, এফএ এবং উয়েফার পক্ষে ফিফা থেকে প্রত্যাহার করা একটি অত্যন্ত জটিল এবং সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত হবে। এমন পদক্ষেপের ফলে ইংল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ক্লাব ও জাতীয় দলগুলোর জন্য ফিফা আয়োজিত বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এটি ফুটবলের বৈশ্বিক কাঠামোতে বড় ধরনের বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে এবং ইউরোপীয় ফুটবলের বাণিজ্যিক ও ক্রীড়াঙ্গনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাধারণত, এফএ এবং উয়েফার মতো সংস্থাগুলো ফিফার ভেতরের থেকে সংস্কার আনার চেষ্টা করে, কারণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার তাদের নিজ নিজ সদস্য দেশগুলির জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং ফুটবলের আন্তর্জাতিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের এই আহ্বান বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমী এবং ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মধ্যে ফিফার শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল একটি দলের চাওয়া নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের একটি বড় অংশের ক্ষোভের প্রকাশ। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এফএ এবং উয়েফা এই আহ্বানে কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং ফিফা তার উপর আরোপিত চাপ মোকাবেলায় ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফুটবলের “সুন্দর খেলা” তার সততা এবং বিশ্বস্ততা পুনরুদ্ধার করতে পারে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে, তবে এই বিতর্ক ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা উস্কে দিয়েছে।
