এডিএইচডি আক্রান্তদের কাজে মনোযোগ ফেরাতে জাদুর মতো কাজ করছে ‘বডি ডাবলিং’: জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের মত
মনোযোগের ঘাটতি এবং অতিসক্রিয়তাজনিত মানসিক অবস্থা বা ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার’ (ADHD) বর্তমান বিশ্বে একটি অত্যন্ত পরিচিত সমস্যা। এডিএইচডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য যেকোনো সাধারণ কাজে মনোযোগ ধরে রাখা বা কোনো কাজ সময়মতো শেষ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সমস্যার সমাধানে ‘বডি ডাবলিং’ (Body Doubling) নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একা একা কাজ করার চেয়ে অন্য কারো সান্নিধ্যে কাজ করলে এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক বেশি কর্মক্ষম ও মনোযোগী হয়ে উঠতে পারেন।
‘বডি ডাবলিং’ মূলত এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যেখানে এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কাজ করার সময় অন্য একজন ব্যক্তিকে নিজের কাছাকাছি রাখেন। মজার বিষয় হলো, এখানে দ্বিতীয় ব্যক্তির সরাসরি কাজে কোনো সাহায্য করার প্রয়োজন পড়ে না। তিনি কেবল পাশে বসে নিজের কোনো কাজ করতে পারেন, বই পড়তে পারেন বা শান্তভাবে বসে থাকতে পারেন। এই নীরব উপস্থিতিই এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে এক ধরণের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা তাকে নিজের কাজে মনোনিবেশ করতে এবং অলসতা বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এডিএইচডি আক্রান্তদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের ঘাটতি থাকে, যা তাদের কাজের অনুপ্রেরণা বা ‘এক্সিকিউティブ ফাংশন’ ব্যাহত করে। যখন অন্য কেউ পাশে থাকে, তখন এক ধরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা ‘সোশ্যাল ফ্যাসিলিটেশন’ তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, মানুষের উপস্থিতি আমাদের অবচেতন মনকে সতর্ক করে তোলে। ফলে মনোযোগ বিচ্যুত হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যায়। এছাড়া, একা কাজ করার সময় যে একাকীত্ব বা মানসিক চাপ তৈরি হয়, পাশে কেউ থাকলে তা অনেকটাই লাঘব হয়।
আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে বডি ডাবলিং এখন আর কেবল সশরীরে উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে এবং বর্তমান ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে ভার্চুয়াল বডি ডাবলিংয়ের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়েছে। এখন জুম (Zoom), মাইক্রোসফট টিমস বা বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্ম যেমন ‘ফোকাসমেট’ (Focusmate)-এর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভার্চুয়ালি এই পদ্ধতি অনুশীলন করা যাচ্ছে। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টিকটক বা ইউটিউবে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমেও অনেকে ভার্চুয়াল বডি ডাবলিং করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বডি ডাবলিংয়ের কার্যকারিতা বাড়াতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, কাজ শুরু করার আগে দুই পক্ষের মধ্যেই একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, “আগামী এক ঘণ্টায় আমি এই ফাইলটি শেষ করব।” দ্বিতীয়ত, কাজের মাঝে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা বিভ্রান্তি এড়াতে হবে। পাশে থাকা ব্যক্তিটিকে এমন হতে হবে যিনি মনোযোগ বিঘ্নিত করবেন না, বরং কাজে উদ্বুদ্ধ করবেন।
পরিশেষে বলা যায়, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার এই যুগে এডিএইচডির মতো জটিলতাকে জয় করতে বডি ডাবলিং একটি অত্যন্ত সহজ অথচ অত্যন্ত কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ওষুধ বা দীর্ঘমেয়াদী থেরাপির পাশাপাশি এই ধরণের আচরণগত পরিবর্তন ও কৌশলগুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অনন্য ভূমিকা পালন করছে।
