যুক্তরাজ্যে বিদ্যুৎ সংকট: মূল্য হ্রাসের সরকারি ঘোষণার পরও কেন কমছে না বিল?
যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ খরচ একটি দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে গার্হস্থ্য বা গৃহস্থালি বিদ্যুতের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও দেশটির ভোক্তারা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হারে বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করে চলেছেন। এই বৈপরীত্যের পেছনে মূলত বেশ কিছু গভীর কাঠামোগত কারণ লুকিয়ে রয়েছে, যা দেশটির জ্বালানি বাজারকে দীর্ঘকাল ধরে প্রভাবিত করছে।
প্রথমত, যুক্তরাজ্যের পাইকারি জ্বালানি বাজারের কাঠামো এবং গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই উচ্চ মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিরাট অংশ এখনও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন বা দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্রিটিশ বিদ্যুতের পাইকারি বাজারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের তুলনায় যুক্তরাজ্যের জ্বালানি আমদানির ধরন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আলাদা হওয়ায় এই মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি সাধারণ গ্রাহকদের পকেটে এসে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত খরচ বা নেটওয়ার্ক চার্জও বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকার ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এবং শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। তবে এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার ব্যয়ভার অনেকাংশেই খুচরা বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা সামগ্রিক খরচকে আরও স্ফীত করে তুলছে।
তৃতীয়ত, সরকারের পক্ষ থেকে ভ্যাট কমানোর উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও, তা অন্যান্য কর ও লেভির তুলনায় সামগ্রিক বিলের ওপর খুব সীমিত প্রভাব ফেলে। বিদ্যুৎ বিলের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে পরিবেশগত ও সামাজিক বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নের খরচ (এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল লেভি)। ফলে কেবল ভ্যাট শূন্যে নামিয়ে আনলেও বিদ্যুতের বাজারমূল্য বা সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর তার বড় ধরনের কোনো ইতিবাচক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে না। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যতদিন পর্যন্ত জ্বালানি খাতের এই মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা না যায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো না যায়, ততদিন ব্রিটিশ নাগরিকদের উচ্চ বিদ্যুৎ বিলের বোঝা বয়ে যেতেই হবে।
