বিশ্ব পোশাক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা হ্রাস: ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার উত্থান

বিশ্ব পোশাক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা হ্রাস: ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার উত্থান

বিশ্বের পোশাক রপ্তানি বাজারে দীর্ঘদিন ধরে দাপটের সঙ্গে অবস্থান করে আসছিল বাংলাদেশ। চীন ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে তৈরি পোশাক খাতে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ঢাকা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইন সংকটের কারণে বাংলাদেশের এই অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বা মার্কেট শেয়ার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে, যার সরাসরি ফায়দা লুফে নিয়েছে ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো।

এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) সুফল ভোগ করছে। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ নীতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে ভিয়েতনাম এখন উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতেও সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে, কম্বোডিয়া তাদের শ্রমবাজারের নমনীয়তা এবং বিশেষায়িত পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মনোযোগ কেড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং পোশাক কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অভাব। এছাড়া, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যে জিএসপি সুবিধা হারাবে, তা নিয়েও ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি লজিস্টিক খরচও বেড়েছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্যের দাম প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি পড়ে যাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা এখন দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তাদের লজিস্টিক খাতের আধুনিকায়নে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, বাংলাদেশ সেই তুলনায় পিছিয়ে আছে। এর ফলে অনেক বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এখন তাদের আদেশের (অর্ডার) একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার হারানোর এই প্রবণতা রুখতে হলে বাংলাদেশকে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং পণ্যের মান উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন কারখানার সংখ্যা আরও বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে, রপ্তানি পণ্যের তালিকায় বৈচিত্র্য আনতে হবে, যাতে কেবল সাধারণ টি-শার্ট বা প্যান্টের ওপর নির্ভরতা কমে। সরকার যদি নীতি সহায়তা সহজীকরণ এবং বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে, তবেই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। অন্যথায়, প্রতিযোগী দেশগুলো যেভাবে তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।