যুক্তরাজ্যে কিশোর-কিশোরীদের জন্য মধ্যরাতে সোশ্যাল মিডিয়া কারফিউর প্রস্তাব, ‘অপ্ট-আউট’ সুবিধা নিয়ে তীব্র বিতর্ক
যুক্তরাজ্যে বয়োজেষ্ঠ্য কিশোর-কিশোরীদের জন্য মধ্যরাতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা ‘কারফিউ’ জারির একটি নতুন প্রস্তাবনা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের কিশোর-কিশোরীরা গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। তবে এই নিয়মে একটি বিশেষ ‘অপ্ট-আউট’ (opt-out) বা সুবিধা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা চাইলে এই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারবে। আর এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
শিশু সুরক্ষা ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রচারণাকারী ও মানবাধিকার সংগঠন এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, কিশোর-কিশোরীদের নিজেদের সিদ্ধান্তেই এই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ দেওয়া হলে পুরো উদ্যোগটিই তার মূল কার্যকারিতা হারাবে। সমালোচকরা এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত ‘খণ্ডিত’ বা ‘অসম্পূর্ণ’ একটি পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তারা মনে করছেন, প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোকে কঠোর নিয়মের আওতায় না এনে ব্যবহারকারীদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বহুগুণ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ বা অনলাইন নিরাপত্তা আইনের অধীনে এই ধরণের বিভিন্ন প্রস্তাবনা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা কাজ করছেন। গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিষণ্নতা, একাকীত্ব এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে রাতের ঘুম ব্যাহত হওয়া তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটেই ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করার অংশ হিসেবে এই রাত্রিকালীন কারফিউর প্রস্তাব আনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবেশাধিকার সীমিত বা নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তবে ব্যবহারকারী যদি নিজে সেটি পরিবর্তন করতে চায়, তবে সেটি সম্ভব হবে। সমালোচকরা বলছেন, মেটা, টিকটক বা স্ন্যাপচ্যাটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ব্যবহারকারীদের স্ক্রিন টাইম ধরে রাখতে পারে, সেজন্যই এই ‘লুপহোল’ বা ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। তারা দাবি করছেন, কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় কোনো ধরনের আপস ছাড়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক নিয়ম কার্যকর করা উচিত এবং অভিভাবকদের হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়া উচিত।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশ এখন কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। উদাহরণস্বরূপ, চীন ইতিমধ্যেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গেম খেলার সময় এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের এই নতুন প্রস্তাবটি যদি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়, তবে তা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তবে এটি আসলে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং আইনটির চূড়ান্ত কাঠামোর ওপর।
