কিম জং উনের কড়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উত্তর কোরিয়ায় তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হচ্ছে কে-পপ

কিম জং উনের কড়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উত্তর কোরিয়ায় তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হচ্ছে কে-পপ

উত্তর কোরিয়ার একনায়কতান্ত্রিক শাসক কিম জং উন চান সেদেশের প্রতিটি নাগরিকের একমাত্র আদর্শ বা ‘আইডল’ হতে কেবল তিনিই থাকবেন। তবে কড়া নিষেধাজ্ঞা আর কঠোর একনায়কতন্ত্রের বেড়াজাল টপকে দেশটির তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে গোপনে জায়গা করে নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীত ‘কে-পপ’ (K-pop)। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা দলত্যাগীরা জানিয়েছেন, চরম দমনপীড়নের মধ্যেও সেখানে গোপনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতি।

বিবিসির সাথে আলাপকালে একাধিক উত্তর কোরীয় দলত্যাগী প্রকাশ করেছেন কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার গান ও নাটক (কে-ড্রামা) তাদের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তারা জানান, সীমান্ত পেরিয়ে চীন থেকে চোরাপথে আসা ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ ও এসডি কার্ডের মাধ্যমে এসব নিষিদ্ধ কনটেন্ট উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করে। দেশটির তরুণরা অত্যন্ত গোপনে, ঘরের জানালা বন্ধ করে বা কম্বল মুড়ি দিয়ে এসব গান শোনে এবং ভিডিও দেখে। দলত্যাগীদের একজন জানান, কিম জং উন নিজেকে দেবতার সমতুল্য দাবি করলেও, তরুণদের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যান্ড দলগুলো এখন আসল নায়ক। গানগুলোর সুর এবং লিরিক্স তাদের এক অন্যরকম মুক্তির স্বাদ দেয়, যা তারা উত্তর কোরিয়ার নিয়ন্ত্রিত জীবনে কখনোই কল্পনা করতে পারে না। ধরা পড়লে যেখানে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড বা শ্রমশিবিরে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হতে পারে, সেখানে এই ঝুঁকি নেওয়াটাই প্রমাণ করে কে-পপের আবেদন কতটা তীব্র।

উত্তর কোরিয়া সরকার এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২০২০ সালে ‘প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ ও সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান আইন’ জারি করে। এই আইনের অধীনে দক্ষিণ কোরিয়ার গান, সিনেমা বা নাটক দেখার জন্য কঠোরতম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি কেউ যদি দক্ষিণ কোরীয় বাচনিক ভঙ্গি বা ভাষা ব্যবহার করে কথা বলে, তাকেও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। কিম জং উনের শাসনামলে এই নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে, কারণ পিয়ংইয়ং মনে করে এই পশ্চিমা ও দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতি তাদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের জন্য একটি বড় হুমকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার এই তরুণ প্রজন্মকে ‘জাংমাদাং প্রজন্ম’ বা বাজার প্রজন্ম বলা হয়। এরা রাষ্ট্রীয় রেশন ব্যবস্থার বাইরে বড় হয়েছে এবং পুঁজিবাদী বাজারের সাথে পরিচিত। তাই এরা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনচেতা এবং নতুন সংস্কৃতি গ্রহণে আগ্রহী। কে-পপ ও দক্ষিণ কোরীয় মিডিয়া উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে বাইরের জগতের একটি জানালা খুলে দিচ্ছে। সরকারি প্রচারণায় এতদিন দাবি করা হতো দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ চরম দারিদ্র্যে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু কে-পপ তারকাদের জমকালো জীবনযাত্রা, ফ্যাশন এবং আধুনিক জীবনধারা দেখে উত্তর কোরিয়ার তরুণরা বুঝতে পারছে যে তাদের এতদিন রাষ্ট্র ভুল তথ্য দিয়ে আসছিল।

পরিশেষে বলা যায়, পারমাণবিক অস্ত্র এবং কঠোর সামরিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া তাদের জনগণের মন থেকে কে-পপের সুর মুছে ফেলতে পারছে না। সুরের এই অদৃশ্য শক্তি কীভাবে একটি অবরুদ্ধ দেশের তরুণ সমাজকে বদলে দিচ্ছে, তা স্বৈরাচারী কিম জং উন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এই সাংস্কৃতিক জোয়ার ঠেকানো উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর জন্য ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে।