বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশচুম্বী। কোটি ভক্তের স্বপ্ন সারথি হয়ে মাঠে নামেন বিশ্বসেরা তারকারা। কিন্তু কখনো কখনো সেই প্রত্যাশার চাপই হয়ে ওঠে দুঃসহ এক বোঝা। সদ্য সমাপ্ত বিশ্বমঞ্চে এমন কিছু মহাতারকার দেখা মিলেছে, যাদের ঘিরে স্বপ্ন বোনা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে তাঁদের বিদায় নিতে হয়েছে এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো থেকে শুরু করে জামাল মুসিয়ালা কিংবা ফেদেরিকো ভালভার্দে—নামগুলো যেমন ভারী, টুর্নামেন্টে তাঁদের ব্যর্থতার খতিয়ানও ঠিক ততটাই ভারী।
গত ৬ জুলাই ডালাস স্টেডিয়ামে পর্তুগাল বনাম স্পেনের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটি যখন শেষ হলো, ক্যামেরার লেন্স তখন অবধারিতভাবেই খুঁজে নিয়েছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসা এই পর্তুগিজ মহাতারকার সামনে এটিই ছিল বিশ্বজয়ের শেষ সুযোগ। তবে মাঠের পারফরম্যান্স মোটেও তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। গোটা টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে মাত্র ৩টি গোল করতে পেরেছেন তিনি, যার মধ্যে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে গোলের দেখা পেয়েছেন। কিন্তু রোনালদোসুলভ সেই চেনা ছন্দ এবার ছিল অনুপস্থিত। যখন লিওনেল মেসি কিংবা আর্লিং হলান্ডের মতো তারকারা নিজেদের দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তখন রোনালদোর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ব্যর্থতার তকমা। শেষ ষোলোর লড়াইয়েই শেষ হয়ে গেছে পর্তুগালের বিশ্বজয়ের রঙিন স্বপ্ন।
মহাতারকা হওয়ার অন্যতম বড় অসুবিধা হলো, ব্যর্থতার ঝড়ে সবচেয়ে বড় আঘাতটি তাঁদের ওপরেই আসে। পর্তুগালের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা ব্রুনো ফার্নান্দেজকে এখন সেই ঝড়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দলের বিদায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এতটাই সমালোচনার শিকার হয়েছেন যে, শেষ পর্যন্ত নিজের কমেন্ট বক্স বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। মাঝমাঠের মূল ভরসা হওয়ার কথা থাকলেও ৫ ম্যাচে কোনো গোল পাননি ব্রুনো, অ্যাসিস্ট করেছেন মাত্র একটি। পুরো টুর্নামেন্টে সাকুল্যে মাত্র পাঁচটি সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন তিনি, যেখানে তাঁর বেশিরভাগ পাসই ছিল ব্যাকপাস কিংবা আড়াআড়ি পাস। এমনকি পিএসজির হয়ে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা ভিতিনিয়া এবং জোয়াও নেভেসের মতো প্রতিভাবান মিডফিল্ডাররাও আক্রমণভাগে বলের জোগান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অন্যদিকে, জার্মান শিবিরের মাঝমাঠেও দেখা গেছে চরম সমন্বয়হীনতা। নবাগত কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত শুরু করা জার্মানি টুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে, ততই খেই হারিয়েছে। ২৩ বছর বয়সী জামাল মুসিয়ালার কাঁধে ছিল মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যে সেতু বন্ধন গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব। কিন্তু চার ম্যাচ খেলে তিনি গোল করেছেন মাত্র একটি, সেটিও দুর্বল কুরাসাওয়ের বিপক্ষে। বাকি ম্যাচগুলোতে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন এই তরুণ তুর্কি। শেষ ৩২-এর ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান তাঁকে একাদশেই রাখেননি। মুসিয়ালার পাসের নিখুঁততার হার ছিল মাত্র ৮০ শতাংশ, যেখানে তাঁর সতীর্থ পাভলোভিচ ও এনমেচার পাসের হার ছিল ৯২ শতাংশ। দলের অধিনায়ক ও রাইট ব্যাক ইউশোয়া কিমিখও কুরাসাওয়ের বিপক্ষে দুটি অ্যাসিস্ট ছাড়া আর কোনো অবদান রাখতে পারেননি। উল্টো রক্ষণে সবচেয়ে বেশি ৭টি ফাউল করেছেন তিনি। জার্মানির হজম করা ৫ গোলের পেছনে তাঁর দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই।
লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি উরুগুয়ের ফেদেরিকো ভালভার্দেকে নিয়েও আশার কমতি ছিল না। কোচ মার্সেলো বিয়েলসা তাঁকে তিনটি ম্যাচেই শুরুর একাদশে রেখেছিলেন। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা মিডফিল্ডার কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। স্পেনের বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ম্যাচের ৬০ মিনিটেই তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই কোচের সাথে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের জেরে মাঠের খেলায় এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে, যার কারণে সমর্থকদের দুয়োও শুনতে হয়েছে তাঁকে। দিনশেষে, এই বিশ্বমঞ্চ যেমন নতুন নায়কদের উত্থান দেখেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠিত তারকার ক্যারিয়ারে এঁকে দিয়েছে ব্যর্থতার এক কালো দাগ।
